kalerkantho


বিশেষ অভিযানের মধ্যেই দূরপাল্লার বাসে আসছে ইয়াবার চালান

মালিকপক্ষকে র‌্যাবের সতর্কতা

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৯ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন ইস্যুতে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছিল। এ আন্দোলন সামাল দিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান কিছুটা শিথিল হয়ে পড়ে। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিত্যনতুন কৌশলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মাদক কারবারিরা ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে। এবার তারা দূরপাল্লার বাসে কক্সবাজার-টেকনাফ থেকে ঢাকায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা নিয়ে আসতে থাকে। ঢাকা থেকে হাত বদল করে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়। ব্যাপক ধরপাকড়ের পরও মাদক পাচারের ট্রানজিট হিসেবে এখনো রাজধানী ঢাকাকেই ব্যবহার করছে কারবারিরা। র‌্যাবসহ পাঁচটি গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে এমন চিত্র উঠে এসেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ফের অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি দূরপাল্লার পরিবহন মালিকদের বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এর আগে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, পাঁচটি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে তৈরি করা তালিকা অনুযায়ী মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে তাদের নির্মুল করা হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি সামাজিকভাবে পরিবার, স্বজন, জনপ্রতিনিধিদের আরো সতর্ক হওয়ার কথাও বলেন মন্ত্রী।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় গত ৩ মে থেকে দেশব্যাপী র‌্যাবের বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। গত তিন মাসে এ বিশেষ অভিযানে ৯৮ হাজার ২৩ জন মাদক কারবারি গ্রেপ্তার হয়েছে। ৬৯ হাজার সাতজনকে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা এবং এক হাজার ১৫৫ জনকে জরিমানা করা হয়েছে। এ সময়ে উদ্ধার করা মাদকের মূল্য প্রায় ৬১১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।

কারা সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে প্রায় এক লাখ বন্দি রয়েছে। এর মধ্যে ৪৪ শতাংশ মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ ছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ৮০ লাখ মাদকাসক্ত রয়েছে। নেশার জগৎ থেকে এদের বের করে আনতে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর মাদক কারবার ও সেবনের সঙ্গে জড়িতদের সরকারি চাকরিতে নেওয়া হবে না বলে একটি খসড়া তৈরির পর তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

মাদকের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, যত দিন মাদক কারবারিদের ট্রানজিট থাকবে রাজধানী ঢাকা, তত দিন পর্যন্ত মাদক নির্মূূল করা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ অন্যান্য বাণিজ্যের মতো ঢাকা থেকেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে মাদক কারবার। রাজধানীতে যেসব গডফাদার রয়েছে, তারাই পালন করছে মুখ্য ভূমিকা। তারাই সারা দেশের পাশাপাশি বিদেশেও মাদকের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। সারা দেশের লাখ লাখ মাদক কারবারিকে তারাই নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু এ গডফাদারদের কেউই ধরা পড়েনি।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্তত ছয় শতাধিক ছোট-বড় মাদক কারবারি রয়েছে এখানে। পুলিশ, র‌্যাব, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ গোয়েন্দা তালিকায় এসব মাদক কারবারির নাম অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সিংহভাগই ধরা পড়েনি। এদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের নেতা, কাউন্সিলর, পুলিশ কর্মকর্তার নামও রয়েছে। এদের সঙ্গে বর্তমানে যুক্ত হয়েছে দূরপাল্লার বাসের চালক ও কিছু কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মচারী। মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবার চালানগুলো টেকনাফ-কক্সবাজার হয়ে সড়ক, রেল ও আকাশপথে রাজধানী ঢাকায় প্রবেশ করছে। এরপর ছড়িছে পড়ছে দেশজুড়ে।

হানিফ এবং শ্যামলী পরিবহনসহ কক্সবাজার থেকে ঢাকায় আসা দূরপাল্লার বাসে ইয়াবা পচারের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে র‌্যাব। এরই মধ্যে এসব বাসের চালক, হেলপার, কন্ডাক্টরসহ আন্তত ২০ জনকে আটক করা হয়েছে। গত বুধবার রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের দুটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে জহির আহম্মেদ ওরফে মৌলভি জহির নামের এক শীর্ষ মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গ্রেপ্তার হওয়ার পর মৌলভি জহির র‌্যাবকে জানায়, মিয়ানমার থেকে টেকনাফ ও কক্সবাজার, সেখান থেকে দূরপাল্লার বাসে ইয়াবার চালান আসছে ঢাকায়। ধরা পড়ার আগে সে দূরপাল্লার বাসে ইয়াবার চালান পাঠিয়ে বিমানে ঢাকায় এসে ওই চালান বুঝে নিত। তার সহযোগীরাও দূরপাল্লার বাসে নিয়মিত ইয়াবার চালান নিয়ে আসছে ঢাকায়। ঢাকাকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে তারা সারা দেশে ইয়াবা ছড়িয়ে দেয়। স্বীকারোক্তিতে তারা জানায়, এ প্রক্রিয়ায় গত এক মাসে দূরপাল্লার বাসে কোটি কোটি টাকার ইয়াবার চালান ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছে।

টেকনাফ, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসা বেশির ভাগ দূরপাল্লার বাসে ইয়াবা বহন করা হলেও তা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কেন—জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা দূরপাল্লার বাসের মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।

র‌্যাব-৩-এর সহকারী পুলিশ সুপার মো. রাসেল বলেন, সম্প্রতি কক্সবাজার থেকে শ্যামলী পরিবহনে ইয়াবার বড় চালান আসার খবর পেয়ে যাত্রাবাড়ী এলাকায় ওই বাসটি থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। প্রথমে বাসটির চালক ও হেলপার বিষয়টি অস্বীকার করে। পরে চালকের সিটের নিচে লুকিয়ে রাখা সাত হাজার পিস ইয়াবাসহ চালক আব্দুল হালিম শেখ ও তার সহকারী রনি মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাসটিও জব্দ করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তারা র‌্যাবকে জানায়, টেকনাফ, কক্সবাজার-ঢাকা রুটে চলাচলকারী বাসগুলোতে তাদের মতো অন্য চালক এবং সহকারীরাও ইয়াবার চালান বহন করে ঢাকায় পৌঁছে দিচ্ছে। বিনিময়ে প্রতি ট্রিপে তাদের আয় হয় ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।

শ্যামলী পরিবহনের মালিক রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, এ ব্যাপারে তারা ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছেন। শ্যামলী পরিবহনের চালকদের কাউন্সেলিং করা হচ্ছে, তারা যেন অপরাধে না জড়ায়।

র‌্যাবের এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, শ্যামলী, হানিফ, গ্রিনল্যান্ডসহ হাই প্রোফাইলের যেসব বাস ঢাকা থেকে কক্সবাজার-টেকনাফ রুটে চলাচল করে এদের বেশিরভাগই ইয়াবার চালান বহন করে। এসব বাসের চালক, হেলপার, কন্ডাক্টর মাদক কারবারে জড়িত।

মৌলভি জহিরের স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায়, তার পরিবারের অন্তত ৩০ জন সদস্য মাদক কারবারে জড়িত। এর বাইরে টেকনাফের বেশ কয়েকজন মাদক কারবারিও তার সঙ্গে জড়িত। তাদের মাদক সিন্ডিকেটে জড়িত পরিবহন খাতে কর্মরত কয়েকজন চালক, চালকের সহকারী, দুটি কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মচারী এবং ঢাকার বেশ কয়েকজন খুচরা কারবারি। আর তাদের সিন্ডিকেটে জড়িত মিয়ানমারের প্রতিনিধি আলম ওরফে বার্মাইয়া আলম।

মিয়ানমার ছাড়াও টেকনাফে বার্মাইয়া আলমের একটি বাড়ি রয়েছে। নৌপথে টেকনাফের মংডু থেকে ইয়াবার চালান এনে নাজিরপাড়া, জালিয়াপাড়াসহ টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় মজুদ করা হয়। পরে টেকনাফ ও কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী বিভিন্ন পরিবহন ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ইয়াবার চালান ঢাকায় পাঠানো হয়। টেকনাফ থেকে ফ্যান, এসি, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি ইলেকট্রনিকস সামগ্রীর ভেতর ইয়াবা লুকিয়ে কুরিয়ারের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠায় এই সিন্ডিকেট সদস্যরা। কুরিয়ারে ঝুঁকি মনে করলে বিভিন্ন পরিবহনের ড্রাইভার ও সহকারীদের সহযোগিতায় রাজধানীতে ইয়াবার চালান পাঠানো হতো।

 



মন্তব্য