kalerkantho


‘জোরপূর্বক’ চাঁদায় আ. লীগ নেতার কাঙালিভোজ!

দলীয় কার্যালয়ের টিভিও কেনা হয় একইভাবে

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল   

১৮ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



জাতীয় শোক দিবসের কাঙালিভোজের জন্য কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার রামদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. আলাউদ্দিন গণচাঁদা তুলে বিতর্কের সৃষ্টি করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, শোক দিবস উপলক্ষে চাঁদা তোলা নিষিদ্ধ হলেও উপজেলার আগরপুর বাসস্ট্যান্ড বাজারের ৩০-৩৫ জন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তিনি এ চাঁদা নেন। এক হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছিল চাঁদার হার।

ব্যবসায়ীদের ধারণা, আদায় করা চাঁদার পরিমাণ হবে কমপক্ষে আড়াই লাখ টাকা। তবে এর মধ্যে এক লাখ ২০ হাজার টাকায় একটি মহিষ কিনে কাঙালিভোজের আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া এই ঘটনার প্রায় দেড় মাস আগে ওই বাসস্ট্যান্ড বাজারে রামদী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ অফিসের জন্য টেলিভিশন কিনতেও গণচাঁদা তোলা হয়।

এ ঘটনায় সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। তবে ভয়ে কেউই মুখ খুলতে রাজি হচ্ছে না। এক ব্যবসায়ী বললেন, নাম প্রকাশ করলেই তাঁরা নির্যাতনের শিকার হবেন। নিরাপত্তার অভাবে কেউ মুখ না খুললেও চাঁদাবাজির ঘটনা দুই দিন ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে।

ব্যবসায়ীরা জানায়, শোক দিবসের আগে দু-তিন দিন ধরে চাঁদা তোলা হয়। চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ ও দলের ১০-১২ জন ‘নেতা’ টাকা তোলার মূল দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বাসস্ট্যান্ড বাজার কমিটির সভাপতি সমিল ব্যবসায়ী মো. মলু মিয়া, দাসপাড়ার কামিনী দাস হত্যা মামলার আসামি নকুল দাস, রামদীর সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান মো. মাহতাব উদ্দিন, পশ্চিম জগত্চরের সাবেক মেম্বার ও দলিল লেখক মো. বাচ্চু মিয়া, ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আগরপুরের বাবু ভূঁইয়া প্রমুখ।

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছে, চাঁদা তোলার সময় চেয়ারম্যান নিজে বাজারের তানজিলের পোল্ট্রি ফিডের দোকানের সামনে, আবার কখনো আওয়ামী লীগ অফিসে অবস্থান করেন। তাঁর প্রতিনিধিরা (দূত) চাঁদার জন্য নির্বাচিত ব্যবসায়ীদের চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে যায়। পরে নানা প্রলোভন এবং তাতে কাজ না হলে ভয়ভীতি দেখিয়ে ও চাপ দিয়ে টাকা আদায় করা হয়। মূলত আওয়ামী লীগ বাদে বিশেষ করে বিএনপির সমর্থক এবং এলাকার বাইরের ব্যবসায়ীদের চাঁদার তালিকায় রাখা হয়।

চার হাজার টাকা চাঁদা দিয়েছেন এমন এক ব্যবসায়ী কালের কণ্ঠকে জানান, চেয়ারম্যানের সামনে ডেকে নিয়ে ‘দূত’দের একজন তাঁকে বলেন, ‘আমরা চেয়ে টাকা নিচ্ছি না। আপনি যা দেবার দেন।’ পরে তিনি দুই হাজার টাকা দিতে চাইলে এক দূত বলে, ‘এ টাকা দিলে নেতা (চেয়ারম্যান) রাগ করবেন।’ পরে তিনি  চার হাজার টাকা দিয়ে মুক্তি পান।

আরেক ব্যবসায়ী নাম-পরিচয় না প্রকাশের শর্তে জানান, চাহিদামতো চাঁদা দিতে অপারগতা জানালে তাঁকে হুমকি দিয়ে বলা হয়, ‘টাকা না দিলে তোর দোকানের সামনে টয়লেট বানানো হবে।’ পরে ওই ব্যবসায়ীও ঠেকায় পড়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দেন। এভাবে কয়েকজনের দোকানে তালা দেওয়ার হুমকি দিয়েও টাকা তোলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ব্যবসায়ীরা হিসাব করে জানায়, সব মিলিয়ে চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে তাঁর সিন্ডিকেট এই কায়দায় কমপক্ষে আড়াই লাখ টাকা চাঁদা তুলেছে। কাঙালিভোজের জন্য এত টাকা খরচ হয়নি। এক লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে একটি মহিষ কিনে তা দিয়েই কাঙালিভোজ সারা হয়েছে।

এর আগে প্রায় দেড় মাস আগে চেয়ারম্যান মো. আলাউদ্দিন বাজারে অবস্থিত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ অফিসের জন্য রঙিন টেলিভিশন কেনার কথা বলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লাখ টাকা চাঁদা তুলেছেন। ওই সময় ব্যবসায়ীদের নানাভাবে চাপ দিয়ে টাকা তোলা হয়। তবে ওই টাকায় বিশাল আকারের টেলিভিশন কেনা সম্ভব হলেও অফিসের জন্য সাধারণ মানের একটি টেলিভিশন কেনা হয়েছে।

বক্তব্য জানতে রামদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. আলাউদ্দিনের মুঠোফোনে গতকাল বিকেলে বারবার কথা বলার চেষ্টা করা হয়। পরে রাতে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলিনি। আমি নিজেই মাসে এক-দেড় লাখ টাকা আয় করি। সাত বছর ধরে আমি একাই কাঙালিভোজের আয়োজন করি।’



মন্তব্য