kalerkantho


বিভাগের রাজনীতি : বরিশাল

হিরনের পথে সাদিক, হিরো থেকে জিরো সরোয়ার

রফিকুল ইসলাম ও আজিম হোসেন, বরিশাল   

১৭ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



আধুনিক বরিশাল নগরী মানেই প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরন। পরিচ্ছন্ন নগরী, উন্নত শহর গড়ার পথ দেখিয়েছেন হিরন। সেই পথে হেঁটেছেন দক্ষিণাঞ্চলের অনেক মেয়রও। হিরনের পর ছন্দপতন ঘটে বরিশাল নগরীর উন্নয়ন কার্যক্রমে। তবে আশার কথা, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনে ফের হিরনের প্রতিচ্ছবি দেখেছে বরিশালের মানুষ। আবারও হাঁটুজল আর কর্দমাক্ত পথ অতিক্রম করে তাদের কাছে যাচ্ছেন হিরনের মতোই আরেকটি মানুষ। শুনছেন দুঃখ-সুখের কথা। তিনি হলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত বরিশালের নবনির্বাচিত নগরপিতা সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার; যিনি বরিশাল বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে দক্ষিণ বাংলার সিংহ পুরুষ। নেতা থেকে কর্মী সবার কাছেই ‘দাদু’ হিসেবে পরিচিত। অভিজ্ঞ এই নেতার জীবনে পরাজয় শব্দের কোনো স্থান নেই। কিন্তু গত ৩০ জুলাইয়ের বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে নেতাকর্মীদের সব আত্মবিশ্বাসকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বরিশাল বিএনপির ইতিহাসে সর্বনিম্ন ১৩ হাজার ভোট পাওয়ায় বরিশাল বিএনপির এই হিরো এখন নেতাকর্মীদের কাছে জিরো হয়ে গেছেন। সঙ্গে সিটি নির্বাচনে সরোয়ারের ‘নীরব ভূমিকা’ নিয়েও নেতাকর্মীদের মনে বিভিন্ন প্রশ্নের উদয় হয়েছে।

সাদিক কলোনিমুখী : সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরনই বরিশালের সাতটি বস্তিকে কলোনিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। সময় পেলেই তিনি ছুটে যেতেন কলোনিবাসীর কাছে। শুনতেন দুঃখ-সুখের কথা। সাদিক আব্দুল্লাহও ঠিক তেমনটিই করেন নির্বাচনের আগে। গত ২৫ জুলাই দিনভর ছিল বৃষ্টি। আর ওই বৃষ্টির পানি জমে ঘরবন্দি ছিল বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পলাশপুর কলোনির বাসিন্দারা। বৃষ্টি আর পানি উপেক্ষা করে সেখানে কর্মীদের নিয়ে ছুটে যান আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। আশ্বাস দেন এই কষ্ট লাঘবের। শুধু পলাশপুর কলোনিই নয়, তিনি একইভাবে পানিবন্দি রসুলপুর রিফিউজি কলোনি, ভাটারখাল কলোনি, বালুরমাঠ কলোনিতে ও স্টেডিয়াম কলোনি গিয়েও মানুষের দুঃখ-সুখের কথা শোনেন এবং প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষের মন জয় করেন।

রিকশায় ঘুরছেন সাদিক : মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর সাদিক আব্দুল্লাহ মানুষের সঙ্গে অকাতরে মিশছেন। রিকশায় ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মানুষের খোঁজ নিচ্ছেন, যা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিরল ঘটনা।

কোন্দল নেই আওয়ামী লীগে : ২০০১ সালে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরনকে। এরপর তিনি মহানগর আওয়ামী লীগকে এমনভাবে সুসংগঠিত করেন, যার প্রতিফলন ঘটে ২০০৮ সালের সিটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিজয়ের মধ্য দিয়ে। ২০১৪ সাল পর্যন্ত হিরনের নেতৃত্বে বরিশাল নগর আওয়ামী লীগ সুসংগঠিত ছিল। তাঁর মৃত্যুর পরে সংগঠনে বিশৃঙ্খলা শুরু হওয়ার উপক্রম দেখা দেওয়ার প্রেক্ষাপটে হাল ধরেন সাদিক আব্দুল্লাহ। এক সুতোয় সব নেতাকর্মীকে গেঁথে ফেলতে সক্ষম হন এ নেতা। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে ঘোষিত নগর আওয়ামী লীগের কমিটিতে যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পান তিন। পদে যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্বে থাকলেও কার্যত প্রায় পুরো নগর আওয়ামী লীগের দায়িত্বই তাঁর কাঁদে বর্তায়। নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে তিনি অন্তত ১০টি করে সভা করেছেন। মেয়র নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে কমিটি করেছেন।

নবনির্বাচিত মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ বলেন, ২০১৩ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা ভোটারদের ভুল বুঝিয়ে হিরনের জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। ফলে দৃষ্টিনন্দন নগরীটি শ্রীহীন নগরীতে পরিণত হয়। মূলত হিরনের সেই নগরী বিনির্মাণের জন্যই জনগণ এবার নৌকায় ভোট দিয়েছে।

‘সিংহ পুরুষ’ যখন নিস্তেজ : মজিবর রহমান সরোয়ার বরিশালে অবস্থান নিলে তাঁর গাড়িবহরের সঙ্গে দুই শতাধিক নেতাকর্মী এমনিতেই থাকে। সড়কে হাঁটলে নেতাকর্মীদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। আর সরোয়ারের কাউনিয়ার বাসভবন থাকত নেতাকর্মীতে পরিপূর্ণ। কিন্তু সেই সরোয়ার মেয়র প্রার্থী হওয়ার পর তাঁর প্রচারাভিযানে নামে মাত্র ২০-৩০ জন কর্মী। সিটি নির্বাচনের প্রচারাভিয়ান শুরুর পর থেকেই বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ারকে উদাসীন দেখা গেছে। বরিশাল সিটি এলাকায় তাঁর স্বল্প কিছু পোস্টার ছিল। প্রচার মাইক ছিল হাতে গোনা কয়েকটি। নির্বাচনী ক্যাম্প ছিল মাত্র কয়েকটি।

ভোটের দিন সরোয়ারের অবস্থানে বিস্মিত কর্মীরা : ৩০ জুলাই ভোটের দিন সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী তাঁর বাসভবন থেকে বের হন। এরপর ৯টায় তাঁর বাসার সামনের মজিদুন্নেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন। পরে সকাল সাড়ে ১১টায় ভোট বর্জন করেন। অভিযোগ রয়েছে, কোনো এজেন্ট কিংবা কর্মী বাহিনীর সঙ্গে সরোয়ার যোগাযোগ করেননি। একেবারেই দায়সারাভাবে বিলম্ব করে ভোটের দিন সকালে মাঠে নেমে দুই ঘণ্টার মধ্যে রুটিন মাফিক ভোট বর্জন করে নিয়েছেন। নেতাকর্মীদের কাছে ‘বরিশালের সিংহ পুরুষখ্যাত’ নেতার এমন আচরণে বিএনপি নেতাকর্মীরা একেবারেই বিস্মিত।

এজেন্ট দেওয়া হয়নি অনেক কেন্দ্রে : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১২৩টি কেন্দ্রের অধিকাংশতেই এজেন্ট দেওয়া হয়নি ধানের শীষ প্রতীকের। প্রায় ৩০টি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসাররা জানান, ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে কোনো এজেন্ট এসে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগই করেননি। বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, ১২৩ কেন্দ্রে মোট এজেন্ট প্রয়োজন ছিল ৭৫০ জন। তবে ধানের শীষের পক্ষে এজেন্ট হতে আগ্রহী ছিল না নেতাকর্মীরা। সব শেষ ২০০ এজেন্ট নির্ধারণ করা হয়েছিল ধানের শীষের পক্ষে। তাঁদের কেন্দ্রে পাঠানো হলেও নিজেরাই ভোট শুরুর পর কেন্দ্র ছেড়ে দেন।

মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, ‘ভোটের আগেই তিনটি থানায় দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দেওয়া হয়েছে। যাদের আসামি করা হয়েছিল, তারাই নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের কথা ছিল। ফলে এজেন্ট দিতে গিয়ে আমরা সমস্যায় পড়েছি। তার পরও যাদের এজেন্ট দেওয়া হয়েছিল, তাদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি বা হুমকি দিয়ে কেন্দ্রছাড়া করা হয়েছে। পাশাপাশি বহিরাগতরা ভোটের দিন কেন্দ্র দখল করেছিল।’



মন্তব্য