kalerkantho


‘মৌলভি সাহেব’ মাদক কারবারি

ওষুধ ব্যবসার আড়ালে ইয়াবা, গ্রেপ্তার ৬
প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার বড়ি জব্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৭ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



‘মৌলভি সাহেব’ মাদক কারবারি

রাজধানীর এলিফেন্ট রোডের দুটি বাসায় অভিযান চালিয়ে মৌলভি জহিরসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। গতকাল কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের ক্যাম্প অফিসে তাদের সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

ষাটোর্ধ্ব জহির আহম্মেদকে পরিচিতজনরা সম্মান করে ‘মৌলভি সাহেব’ বলে সম্বোধন করত। টেকনাফে তাঁর রয়েছে ওষুধের দোকান। সব সময় তিনি মাথায় টুপি আর হাতে তসবি রাখতেন। ঢাকা ও টেকনাফে দুই জায়গায় অবাধে বিচরণ করলেও তাঁর এই ভদ্র বেশের আড়ালে লুকিয়ে ছিল অন্য রহস্য। এত দিন তিনি একজন বড় ইয়াবা কারবারি ছিলেন তা কেউ জানত না। এ ছাড়া তাঁর সঙ্গে ইয়াবা কারবারে সম্পৃক্ত তাঁর স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে ও জামাতাসহ অন্য স্বজনরাও।

গত দুই দিনে রাজধানীর এলিফেন্ট রোডের দুটি বাসায় অভিযান চালিয়ে মৌলভি জহিরসহ আরো ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের ক্যাম্প অফিসে এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান।

গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা হলেন জহির আহম্মেদ ওরফে মৌলভি জহির (৬০), মমিনুল আলম (৩০), ফয়সাল আহম্মেদ (৩১), মিরাজ উদ্দিন নিশান (২১), তৌফিকুল ইসলাম ওরফে সানি (২১) ও সঞ্জয় চন্দ্র হালদার (২০)। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে দুই লাখ সাত হাজার ১০০ পিস ইয়াবা এবং মাদক বিক্রির ১৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। র‌্যাবের ভাষ্য, উদ্ধার করা ইয়াবার মূল্য প্রায় সাত কোটি ২৫ লাখ টাকা।

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, গ্রেপ্তারকৃতরা সবাই মৌলভি জহিরের ঘনিষ্ঠ। এই চক্রের দুই সদস্য আমিন ও নুরুল আমিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি। জহিরের পুরো পরিবার এই ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। জহির ও তাঁর বড় ছেলে বাবু পাঁচ-ছয় বছর ধরে ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় বাসা ভাড়া করে ইয়াবা কারবার চালিয়ে আসছিলেন। বাবু গত ২৫ এপ্রিল মাদকদ্রব্যসহ ধানমণ্ডি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে জেলে।

র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত ফয়সাল আহাম্মেদ জানান, তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকে অফিসার হিসেবে কর্মরত। নিশান একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্র, সানি একটি কলেজে ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে প্রথম বর্ষের ছাত্র। অন্য গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি সঞ্জয় চন্দ্র হালদার এইচএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। সংঘবদ্ধ চক্রের এই সদস্যরা টেকনাফ থেকে শুরু করে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

ব্রিফিংয়ে মুফতি মাহমুদ দাবি করেন, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে জহির চক্রের মূলহোতা। তাঁর সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও টেকনাফের বেশ কয়েকজন মাদক কারবারি জড়িত। এ ছাড়া এই সিন্ডিকেটে জড়িত পরিবহন খাতে কর্মরত কয়েকজন চালক ও চালকের সহকারী, দুটি কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মচারী এবং ঢাকার বেশ কয়েকজন খুচরা কারবারি। সব মিলিয়ে এই সিন্ডিকেটের সদস্যসংখ্যা কমপক্ষে ৩০। এই সিন্ডিকেটের মিয়ানমারের প্রতিনিধি আলম ওরফে বার্মাইয়া আলম। তিনি মিয়ানমারের মংডুতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এ ছাড়া টেকনাফেও বার্মাইয়া আলমের একটি বাড়ি আছে। নৌপথে টেকনাফের মংডু থেকে ইয়াবা পাচার করে নাজিরপাড়া, জালিয়াপাড়াসহ টেকনাফের বিভিন্ন এলাকার বাড়িতে ইয়াবা মজুদ রাখেন। পরে চক্রের সদস্যরা টেকনাফ ও কক্সবাজার থেকে বিভিন্ন পরিবহন ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ইয়াবা ঢাকায় পাঠানের কাজ করে।

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, টেকনাফ থেকে ফ্যান, এসি, ওয়াশিং মেশিনের মতো বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সামগ্রীর ভেতরে ইয়াবা লুকিয়ে কুরিয়ারের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠায় এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা। কুরিয়ারে ঝুঁকি থাকলে নির্দিষ্ট দুই ব্যক্তি এবং বিভিন্ন পরিবহনের চালক ও সহকারীদের মাধ্যমেও ইয়াবার চালান পাঠায় তারা। উদ্ধার করা ইয়াবাগুলো সাত দিন আগে দুটি চালানে কার্টনে এসি ও ফ্যানের ভেতরে ঢুকিয়ে ঢাকায় আনা হয়েছিল।

জহিরকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে মুফতি মাহমুদ খান ব্রিফিংয়ে বলেন, ১০-১৫ বছর আগে রোজিনা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসা চালু করেন জহির। তখন সাইফুল নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে তিনি ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়েন। টেকনাফ এলাকার ইয়াবা ব্যবসার সব যোগাযোগ রক্ষা করেন জহিরের স্ত্রী। এই চক্রের সদস্যরা ইয়াবা বিক্রির অর্থ ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার, মোবাইল ব্যাংকিং ও হুন্ডির মাধ্যমে টেকনাফে পাঠিয়ে থাকে।



মন্তব্য