kalerkantho


আজিমপুর সরকারি কলোনি

অবৈধ দোকানের ছড়াছড়ি, ফায়দা লুটছে কল্যাণ সমিতি ও নেতারা

জহিরুল ইসলাম   

১৬ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



নানা সমস্যায় জর্জরিত রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কলোনি। শত শত অবৈধ দোকান, পূতিগন্ধময় পরিবেশ, বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ, উঠতি বয়সী ছেলেদের অশালীন চলাফেরা কলোনিবাসীর জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উত্তরাঞ্চল (জোন-এ), মধ্যাঞ্চল (জোন-বি) ও দক্ষিণাঞ্চল (জোন-ডি)—এই তিন কলোনিতে বর্তমানে বাস করছে প্রায় এক হাজার ৩০০ পরিবার। এর মধ্যে দক্ষিণাঞ্চল জোনে ১০টি ভবনে ১৬৪টি পরিবার, মধ্যাঞ্চল জোনে ছয়টি ২০ তলা নতুন ভবনে ৪৬৫টি পরিবার এবং উত্তরাঞ্চল জোনে ৩৮টি ভবনে রয়েছে ৬৭৪টি পরিবার। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কলোনির জনসংখ্যা। আর এই বিপুল মানুষের চাহিদাকে পুঁজি করে কলোনির ভেতরে-বাইরে অবৈধভাবে বসে গেছে দুই শতাধিক দোকান। সেসব দোকান থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতা এবং কলোনিভিত্তিক কল্যাণ সমিতি।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, অবৈধ দোকানের কারণে বাইরে থেকেও মানুষ কলোনিতে এসে ভিড় জমাচ্ছে। তাদের অনেকের আচার-আচরণ ও চলাফেরা আপত্তিজনক। দোকানের ময়লা ফেলা হচ্ছে যত্রতত্র। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ময়লা কলোনির পরিবেশ দূষিত করছে। ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন নেতারা দোকান বসিয়ে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এর সঙ্গে জড়িত কলোনিভিত্তিক সংগঠনগুলোর একটি অংশও।

দক্ষিণাঞ্চল জোনের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কলোনিতে আছি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। এখানে সমিতি থাকলেও কাজের বেলায় কিছু দেখি না। বাইরের লোকেরা এসে এখানে স্থায়ী-অস্থায়ী দোকান বসাচ্ছে। সমস্যায় পড়েছি আমরা। অথচ কলোনির সমিতিগুলো কিছুই বলছে না। গণর্পূত বিভাগও অনেক ক্ষেত্রে চুপ। কলোনির কয়েকজন আবার নিজেদের ছাত্রলীগের পোস্টধারী দাবি করে চাঁদা তুলছে। এরাই আবার মূল সড়কের পাশে ফুটপাতে অবৈধ দোকান বসিয়ে টাকা নিচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, লালবাগ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান জামাল আজিমপুর এলাকায় কলোনি ও রাস্তার পাশের ফুটপাতে অস্থায়ী দোকান বসিয়ে অগ্রিম ও মাসিক ভাড়া হিসেবে অর্থ নিচ্ছেন। তাঁর পক্ষে কাজটি করে থাকেন মাকসুদ নামের একজন। এ ছাড়া থানা ছাত্রলীগের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক রায়হান স্বরণ এর সঙ্গে জড়িত বলে একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

তবে অবৈধভাবে দোকান বসিয়ে টাকা তোলার বিষয়টি অস্বীকার করেন মতিউর রহমান জামাল। তিনি বলেন, ‘আমি বা আমার লোকজন কোনো ধরনের টাকা তোলে না। উপরন্তু দলের কোনো কর্মী যাতে এ ধরনের কাজে জড়িত না হয় সে জন্য নিজের পকেট থেকে তাদের টাকা দিই। দলের দুর্নাম করার জন্য এই ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’

সম্প্রতি সরেজমিনে কলোনি ঘুরে দেখা যায়, উত্তরাঞ্চল জোনের দক্ষিণ গেট দিয়ে ঢুকতেই সামনে মাঠের দিকে তাকালে বড় বড় ছাতার নিচে বসেছে সবজিসহ বিভিন্ন অস্থায়ী দোকান। গেটের সঙ্গে বামপাশে সমবায় ফার্মেসি, বিউটি পার্লার ও গোস্তের দুটি স্থায়ী দোকান। পাশে ডিম, কাপড় ও মসলার আরো পাঁচটি অস্থায়ী দোকান। সমবায় বাজারের পাশে রাস্তায় আরো প্রায় ২৫টি অবৈধ দোকান রয়েছে। ইডেনের অপর পাশে কলোনির গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই বামপাশে রয়েছে কলোনির গড়া আজিমপুর কমিউনিটি সেন্টার এবং কমিউনিটি সিটি সেন্টার মার্কেটের ১০টি স্থায়ী ফটোকপি ও খাওয়ার দোকান। বেশ কয়েকটি অস্থায়ী দোকানও রয়েছে সেখানে।

এক দোকানি বলেন, ‘এখানকার দোকান বৈধ না অবৈধ তা জানি না। অগ্রিম টাকা দিয়ে ভাড়া নিয়েছি, আর প্রতি মাসে ভাড়া দিই। ভাড়া নেয় কমিউনিটি সেন্টার। এরপর কী হয় জানি না। কলোনিতে অগ্রণী স্কুল অ্যান্ড কলেজের গেটের সামনে প্রায় ৩০টি কাপড়ের দোকান ও ১০-১২টি খাবারের দোকান বসে নিয়মিত। আইসক্রিম বিক্রেতাদের একজন বলেন, ‘জামালকে (মতিউর রহমান জামাল) ১০০ টাকা, কমিউনিটি সেন্টার কমিটিকে ৮০ টাকা ও সিকিউরিটিকে প্রতিদিন ৪০ টাকা দিতে হয়। নইলে বসতে দেয় না।’

মধ্যাঞ্চল জোনে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরের সড়কে প্রায় ২০টি এবং দক্ষিণ গেটের পাশে ২০টি কাপড়ের দোকান ও ১২-১৪টি সবজির দোকান। গেটের একটু বাইরে ছাপড়া মসজিদের সামনে রয়েছে আরো ৪০টির বেশি সবজি, কাপড়, চাসহ অন্যান্য দোকান। আর ছাপড়া মসজিদ থেকে মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের মাঝে আজিমপুর মাতৃসদন থেকে শুরু করে ছাপড়া মসজিদের আশপাশের ফুটপাতে রয়েছে আরো ৫০টির মতো অস্থায়ী দোকান। উত্তর গেটে রয়েছে পুরনো আসবাবের তিন-চারটি দোকান। গেটের বাইরেও রয়েছে কয়েকটি স্থায়ী অবৈধ দোকান। এতিমখানার দিক থেকে এই কলোনিতে প্রবেশের গেট থাকলেও ব্যবহারের মতো অবস্থা নেই। ভাগাড় আর রিকশার গ্যারেজ রাস্তা দখল করে রেখেছে।

অভিযোগ রয়েছে, কলোনিজুড়ে অবৈধভাবে বসানো দুই শতাধিক স্থায়ী-অস্থায়ী দোকান থেকে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতারা ছাড়াও টাকা পাচ্ছে কলোনিভিত্তিক কল্যাণ সমিতি এবং গণপূর্ত বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা। এ বিষয়ে কথা বললে আজিমপুর সরকারি কলোনি মধ্যাঞ্চল সমিতির সভাপতি মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘দোকানের কারণে সমস্যা তো হচ্ছেই। তবে আমরা দোকান বসাইনি। কারা বসাচ্ছে একটু খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন। কলোনির নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত কর্মীদের টাকা তুলতেই আমাদের হিমশিম খেতে হয়।’

আজিমপুর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ইলিয়াস আহমেদ বলেন, ‘কমিউনিটি সেন্টারটি কলোনিবাসীর জন্য গণপূর্ত বিভাগই করে দিয়েছিল। তবে দোকানগুলোর কোনো বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও মনে হয় বৈধ।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি এখানে নতুন এসেছি। দোকানগুলো থেকে নিয়মিত টাকা তোলা হয় এমনটি আমার জানা নেই। তবে এর সঙ্গে আমার দপ্তরের কেউ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



মন্তব্য