kalerkantho


গাজীপুরে মা-বাবা মেয়ের লাশ উদ্ধার

হাত গুটিয়ে পুলিশ ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর   

২৪ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



গাজীপুর নগরের হায়দারাবাদ এলাকায় চাঞ্চল্যকর মা-মেয়ে খুন এবং বাবার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনার রহস্য পাঁচ দিনেও উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। বরং তদন্তে অনীহা দেখিয়ে অনেকটা হাত গুটিয়ে নিয়েছে। এ নিয়ে এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ।

গত বৃহস্পতিবার নিজের বাসা থেকে গৃহকর্তা কামাল হোসেন (৪০), তাঁর স্ত্রী নাজমা আক্তার (৩৫) ও মেয়ে মেধাবী ছাত্রী সানজিদা আক্তার রিমির (১৮) লাশ উদ্ধার করা হয়।

জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জয়দেবপুর থানার পুবাইল ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কামালের ঝুলন্ত লাশ দেখে এটা অনেকটাই স্পষ্ট, কামাল নিজেই আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যা করলে যে ধরনের লক্ষণ থাকে, তার সবই কামালের লাশের মধ্যে ছিল।’ তিনি আরো বলেন, আত্মহত্যার আগে কামাল মেয়ে ও স্ত্রীকে খুন করেছেন। তাঁর লাশ যেখানে ঝুলন্ত ছিল তার পাশে টেবিলে অনেকগুলো সিগারেট খাওয়ার আলামত (খাওয়া সিগারেটের টুকরা) পাওয়া গেছে। পাশেই একটি রক্তমাখা চাকু পাওয়া গেছে। চাকুতে লম্বা চুল জড়ানো ছিল। কামাল ঋণগ্রস্ত ছিলেন। তিনি ইয়াবা সেবন করতেন। পরে নানা হতাশা থেকে তিনি স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন। তাঁর বাবা এজাহারেও একই কথা উল্লেখ করেছেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, গত শুক্রবার কামালের ঘর থেকে দুটি ডায়েরি উদ্ধার হয়েছে। ডায়েরিগুলো মেয়ে রিমির। রিমি বিভিন্ন সময় লিখেছেন, তাঁর বাবা মাকে মারধর করতেন। এটা তাঁকে মানসিক কষ্ট দিত।

এসআই শফিকুল বলেন, এ ছাড়া লাশ তিনটির ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদন থেকে জানা যাবে কামাল আত্মহত্যা করেছেন, না কেউ তাঁকে হত্যা করেছে। এ কারণে প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছেন তিনি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর নতুন করে তদন্ত করা হবে। তবে কামালের কত টাকার ঋণ ছিল জানাতে পারেননি তিনি।

এদিকে এলাকাবাসী ও কামালের শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অভিযোগ, কামালের বাবা ও ভাইয়ের অভিযোগের বাইরে তদন্ত করছে না পুলিশ।

কামালের প্রতিবেশী ও বাল্যবন্ধু মোহাম্মদ আলীসহ কয়েকজন এলাকাবাসী বলেন, কামালকে তাঁরা ছোট বেলা থেকেই চেনেন। কোনো দিন মাদক সেবন করতে দেখেননি। কিছুতেই তিনি এ ঘটনা ঘটাতে পারেন না। মা-মেয়ের শরীরে অসংখ্য আঘাত রয়েছে। আঘাত দেখে মনে হয়েছে, প্রচণ্ড ক্ষোভ থেকে মা ও মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী যদি কামালই খুন করে থাকেন, তাহলে তাঁর শরীরে রক্ত লাগার কথা। অথচ কামালের শরীরে কোনো রক্ত ছিল না। দেখে মনে হয়েছে তিনি বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর বাঁ হাতের কবজিতে বড় কাটা ছিল। তাঁরা মনে করেন, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তাঁরা উচ্চপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাকে দিয়ে ঘটনার তদন্ত দাবি করেছেন।

কামালের ভায়রা রাসেল মাহমুদ বলেন, কামাল ভালোবেসে নাজমাকে বিয়ে করেছিলেন। তাই কামালের পরিবার তাঁদের মেনে নেয়নি। এমনি পৈতৃক জমি থেকেও বঞ্চিত করা হয়। তাঁদের একমাত্র মেয়ে সানজিদা আক্তার রিমি পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি এবং এসএসসি ও এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ পেয়ে মেডিক্যালে ভর্তির চেষ্টা করছিলেন। রিমিকে নিয়ে গর্ব করতেন কামাল। তিনি এ কাজ করতে পারেন বিশ্বাস হয় না। এ খুনের পেছনে অন্য কারো হাত রয়েছে রাসেল মনে করেন।

রিমি ও তাঁর মা নাজমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন থাকার কথা জানিয়ে রাসেল আরো বলেন, কোনো বাবা মেয়ের প্রতি এতটা বিকৃত আচরণ করতে পারেন না। পরিবারের লোকজনের অতীত আচরণ এবং হত্যাকাণ্ডের পরের ঘটনা মেলালে অনেক রহস্যের গন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ সেদিকে তদন্ত করতে চাইছে না।

নাজমার বড় ভাই আমিন উদ্দিন বলেন, কামালের বাবা এজাহারে উল্লেখ করেছেন যে তাঁর ছেলে বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। অজ্ঞাত কারণে তিনি নিজের মেয়ে ও স্ত্রীকে খুন করে আত্মহত্যা করেছেন। ঘটনার সময় তিনি তো সেখানে ছিলেন না, তাহলে কেন এজাহারে এমন কথা লিখলেন—এটাও তদন্ত করা দরকার।



মন্তব্য