kalerkantho


কোটাপন্থীদের ওপর আবারও হামলা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

২৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



কোটাপন্থীদের ওপর আবারও হামলা

চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর আবারও হামলার ঘটনা ঘটেছে। কোটা সংস্কারসহ বিভিন্ন দাবিতে গতকাল রবিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র সমাবেশ শেষে ফেরার পথে আন্দোলনকারীদের ওপর এই হামলা হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও এক শিক্ষার্থীকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ছাত্রলীগকে দায়ী করেছে আন্দোলনকারীরা।

কোটা পদ্ধতির সংস্কার, ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার বিচার, গ্রেপ্তারকৃত কোটা আন্দোলনের নেতাদের মুক্তি ও নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে গতকাল বিকেল ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে ছাত্র সমাবেশের আয়োজন করে কোটাপন্থী শিক্ষার্থীরা। সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীসহ বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আতাউল্লাহ, সোহরাব হোসেন, রাতুল সরকার, নিয়াজী প্রমুখ অংশ নেন।

সমাবেশ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। একই দাবিতে আগামী ২৫ জুলাই বুধবার সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেন ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক বিন ইয়ামিন মোল্লা। তিনি বলেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। অথচ এই আন্দোলন বাধাগ্রস্ত করতে একটি কুচক্রী মহল প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করলেও আমাদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। আবার আমাদেরকেই আটক ও রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সমাবেশ চলাকালে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রাজু ভাস্কর্য ঘিরে অবস্থান নেয়। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সমাবেশ শেষে ফেরার পথে আন্দোলনকারীদের ওপর তারা হামলা চালায়। আন্দোলনকারীরা টিএসসির পাশে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক দিদার মো. নিজামুল হকের নেতৃত্বে জিয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ লিমনসহ বিভিন্ন হল শাখার নেতাকর্মীরা এই হামলা চালায় বলে জানা গেছে।

সমাবেশ শেষে আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক সোহরাব হোসেন, রাতুল সরকার ও নিয়াজী একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ক্যাম্পাস ছেড়ে যান। আরেকটি ট্যাক্সি ক্যাবে করে যান আতাউল্লাহ ও বিন ইয়ামিন মোল্লা। এ সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মোটরসাইকেল নিয়ে সিএনজি ও ট্যাক্সি ক্যাবের পিছু নেয়। একপর্যায়ে রাজধানীর কাঁটাবন এলাকায় সিএনজি থামিয়ে সোহরাব, রাতুল ও নিয়াজীকে মারধর করে। তাঁদের মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা চালায় হামলাকারীরা। এ সময় তাঁরা দৌড়ে আত্মরক্ষা করেন।

কোটা আন্দোলনের নেতাদের ওপর হামলাকারীদের মধ্যে ছাত্রলীগের কর্মসূচি ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপসম্পাদক মুরাদ হায়দার টিপু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইদুর রহমান উজ্জ্বল ও জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আমির হামজাকে দেখা গেছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, কোটা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে আহত করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কর্মীরা। রাকিব নামের ওই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফেডারেশনের আহ্বায়ক। গতকাল দুপুরে ক্যাম্পাসে বিবিএ ভবনের সামনে এই হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার সময় তাঁর নাক ফেটে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, নৃবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিব বিবিএ ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় ছাত্রলীগের ১০-১২ জন কর্মী তাঁকে ডেকে নিয়ে বেধড়ক পেটাতে থাকে। আহত অবস্থায় সহপাঠিরা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।

হামলার শিকার রাকিব বলেন, কোটা আন্দোলনে যুক্ত থাকায় ছাত্রলীগ কর্মীরা তাঁকে বিনাদোষে মেরেছে। তবে তাত্ক্ষণিকভাবে তিনি হামলাকারীদের পরিচয় জানাতে পারেননি। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘বিষয়টি শুনেছি। তবে কোনো ফরমাল অভিযোগ পাইনি।’

শিক্ষকদের একাংশের মানববন্ধন : কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে শিক্ষার্থীদের উসকে দিয়ে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগ এনে উসকানিদাতা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশ। ‘সচেতন শিক্ষক সমাজ’ ব্যানারে গতকাল কলা ভবনের সামনে এক মানববন্ধনে এ দাবি জানানো হয়।

মানববন্ধনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এস এম মাকসুদ কামাল, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিম, শামসুন্নাহার হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক সুপ্রিয়া সাহা, রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক জিনাত হুদা, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দীন, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সৌমিত্র শেখরসহ শতাধিক শিক্ষক অংশ নেন।

অধ্যাপক মাকসুদ কামাল বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক শিক্ষার্থীদের উসকে দিয়ে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করতে চাচ্ছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই। একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়রানি না করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সবাই মিলে একটি পরিবার। পরিবারের কোনো সমস্যা হলে আমরা সমাধান করব। শিক্ষার্থীরা কোটা আন্দোলন করছে। এটি একটি যৌক্তিক আন্দোলন। আমরা এই আন্দোলনকে সমর্থন জানাই। সরকারও তাদের দাবি মেনে নিয়েছে। সরকার একটি কমিটি করে দিয়েছে। তার পরও একটি মহল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।’

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের কোটা দাবি : সরকারি চাকরিতে ৫ শতাংশ কোটা দাবি করেছে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে শুধু প্রতিবন্ধীদেরই ১০ শতাংশ কোটা দাবি তাদের। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ঐক্য পরিষদ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়।

সংগঠনের আহ্বায়ক আলি হোসেন বলেন, ‘আমরা প্রতিবন্ধীরা সব ক্ষেত্রে অবহেলিত। সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের পরও আমরা বঞ্চনার শিকার হচ্ছি। আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে তাঁর কাছে সরাসরি দাবি জানাতে চাই।’

লিখিত বক্তব্যে সংগঠনের আহ্বায়ক বলেন, ‘প্রতিযোগিতামূলক চাকরির পরীক্ষায় প্রতিবন্ধীরা প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে যায়। তাই আমরা প্রতি ঘণ্টায় ১০ মিনিট সময় বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি। তা ছাড়া অসচেতনতার কারণে প্রতিবন্ধীরা সঠিক সময়ে লেখাপড়া করতে পারে না। সে জন্য প্রতিবন্ধীদের জন্য চাকরিতে প্রবেশসীমা ৩৭ বছর করার দাবি আমাদের।’

সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য দেন সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আলহাজুদ্দিন, সুরাইয়া আহমেদ, রুবেল মিয়া, মো. হাসান, আমজাদ হোসেন প্রমুখ।

 



মন্তব্য