kalerkantho


মিয়ানমারে আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার

রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুতি ঘিরেই রুলিং চান প্রসিকিউটর

মেহেদী হাসান   

২২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুতি ঘিরেই রুলিং চান প্রসিকিউটর

রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, নির্যাতন-নিপীড়নের মতো অভিযোগে নয়, বরং বাস্তুচ্যুতির কারণে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) বিচারিক এখতিয়ারের বিষয়ে রুলিং চেয়েছেন আইসিসি প্রসিকিউটর ফেতু বেনসুদা। রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমার আইসিসির সদস্য না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই দেশটির ওপর নেদারল্যান্ডসের হেগভিত্তিক আন্তর্জাতিক ওই আদালতের বিচারিক এখতিয়ার নেই। তবে এ সংকটের শিকার বাংলাদেশ আইসিসির সদস্য। এই জটিল সমীকরণের হিসাবের মধ্যেই আইসিসির রুলিংয়ের অপেক্ষায় এর প্রসিকিউটরসহ সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি আইসিসি ও এর প্রসিকিউটরের দপ্তরের উন্মুক্ত করা আইনি নথিগুলোতে দেখা গেছে, আইসিসি প্রসিকিউটর গত মাসের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত প্রি-ট্রায়াল চেম্বারের সঙ্গে স্ট্যাটাস কনফারেন্সে আদালতকে রুলিং দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বিষয়ের ওপরই গুরুত্ব দেওয়ার আবেদন করেছেন। আর সেটি হলো রোহিঙ্গাদের গণবাস্তুচ্যুতি।

আইসিসিকে তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, এ ধরনের ক্ষেত্রে আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত দেওয়া রোম স্ট্যাটিউটের আইনি কাঠামোর সঙ্গেই সংগতিপূর্ণ হবে। তিনি বলেছেন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পাড়ি দিতে বাধ্য করা হলে তা দেশান্তরীকরণের অপরাধ। দ্বিতীয় কোনো রাষ্ট্রে স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে এ অপরাধ সম্পন্ন হয়। এটি ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ এবং এর সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতির পুরোপুরি সাদৃশ্য রয়েছে।

আইসিসি গত ২১ জুন এক আদেশে কোন প্রেক্ষাপটে মিয়ানমার থেকে ছয় লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হলো তার ব্যাখ্যা এবং আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার প্রসঙ্গে অভিমত জানাতে নেপিডোকে আগামী ২৭ জুলাই বিকেল ৪টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। আইসিসির সেই আদেশ আদালতের রেজিস্ট্রার মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মিয়ানমার তা গ্রহণ করেনি। মিয়ানমার ওই আদেশে সাড়া দেবে না বলেও এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছে। এর ফলে আইসিসি কী রুলিং দেবে তা দেখার জন্য সংশ্লিষ্টরা অপেক্ষায় আছেন।

এদিকে আইসিসি প্রসিকিউটর ছাড়াও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বেশ কজন অ্যামিকাস কিউরি মিয়ানমারের ওপর বিচারিক এখতিয়ার প্রশ্নে লিখিতভাবে আদালতে যুক্তি তুলে ধরেছেন। এরপর সেই যুক্তিগুলোর বিষয়ে আইসিসি প্রসিকিউটর আদালতকে তাঁর অবস্থান জানান। অ্যামিকাস কিউরিদের অনেক যুক্তির সঙ্গে আইসিসি প্রসিকিউটরের অবস্থানের সাদৃশ্য রয়েছে।

জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের দুটি গ্রুপ এবং পাঁচজন অ্যামিকাস কিউরি আদালতে তাঁদের পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেছেন। তাঁরাও আইসিসি প্রসিকিউটরের জোর দেওয়া বিষয়টির সঙ্গে ভিন্ন মত পোষণ করেননি। বরং সেগুলো আইসিসি প্রসিকিউটরের অবস্থানকে আরো যুক্তিসংগত করেছে। তাঁরাও জোর দিয়ে বলেছেন, একাধিক অপরাধ বিবেচনায় না নিয়ে বাস্তুচ্যুত করার অপরাধের ভিত্তিতেই আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার প্রশ্নে সিদ্ধান্তে আসা উচিত।

অ্যামিকাস কিউরিদের পর্যবেক্ষণ প্রসঙ্গে আইসিসি প্রসিকিউটর বলেছেন, বিচারিক এখতিয়ার বিষয়টি আদালত নিশ্চিত করলে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ তদন্ত করার প্রাথমিক দায়িত্ব একচ্ছত্রভাবে প্রসিকিউটরের দপ্তরের ওপর বর্তাবে।

আইসিসি প্রসিকিউশন অ্যামিকাস কিউরিদের অবস্থানের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতির কারণ তাদের ওপর সব ধরনের যৌন সহিংসতাসহ অন্যান্য নিপীড়ন। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসার কারণ তদন্তের সুযোগ পেলে এসব অপরাধও তদন্তের আওতায় আসবে।

অ্যামিকাস কিউরি ও ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষগুলোর অনেকে আদালতে যুক্তি দিয়েছেন, রোম স্ট্যাটিউট অনুযায়ী রোহিঙ্গা গণহত্যা, নিপীড়ন, হত্যা, জোরপূর্বক গর্ভধারণে বাধ্য করার মতো অভিযোগে মিয়ানমারকে বিচারের আওতায় আনার এখতিয়ার আইসিসির আছে। তবে উইমেনস ইনিশিয়েটিভ ফর জেন্ডার জাস্টিস (ডাব্লিউআইজিজে) জোর দিয়ে বলেছে, মিয়ানমারে এসব অপরাধের বিচারিক এখতিয়ার আইসিসির নেই।

আইসিসি প্রসিকিউটরও ডাব্লিউআইজিজের অবস্থানের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেছেন, মিয়ানমার আইসিসির এখতিয়ার মেনে না নিলে বা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আইসিসিকে এ বিষয়ে বিচারের এখতিয়ার না দিলে রোহিঙ্গা গণহত্যা, নিপীড়ন, হত্যা, জোরপূর্বক গর্ভধারণে বাধ্য করার মতো অভিযোগে মিয়ানমারের বিচার আইসিসি করতে পারবে না।

উল্লেখ্য, মিয়ানমারকে বিচারের মুখোমুখি করতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এখনো ঐক্যবদ্ধ কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি। রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আসার কারণ তদন্তে আইসিসি যদি কোনো উদ্যোগ নেয় তবে তা মিয়ানমারকে জবাবদিহি করানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

 

 



মন্তব্য