kalerkantho


ঘরে মা-মেয়ের বারান্দায় বাবার লাশ

হত্যার পর আত্মহত্যা এ কথা মানছে না স্বজনরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর   

২২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



গাজীপুর শহরের হায়দারাবাদ এলাকায় গত বৃহস্পতিবার ঘরের শয়নকক্ষে মা-মেয়ের রক্তাক্ত এবং বারান্দায় বাবার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় মামলা হয়েছে। গত শুক্রবার রাতে নিহত কামাল হোসেনের বাবা হাশেম মিয়া (৭০) বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলার এজাহারে হাশেম মিয়া উল্লেখ করেন, ‘তাঁর ছেলে মানসিক বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। অজ্ঞাত কারণে সে নিজ মেয়ে ও স্ত্রীকে হত্যা করে আত্মহত্যা করেছে।’

কিন্তু কামাল স্ত্রী নাজমা ও মেয়ে সানজিদা রিমিকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছেন—এ কথা বিশ্বাস করছে না নাজমার স্বজন ও কামালের প্রতিবেশীসহ এলাকার অন্যরা।

কামালের বন্ধু ও প্রতিবেশী মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘কামাল ও তিনি বাল্যবন্ধু। একসঙ্গে স্কুলে পড়েছেন। কোনো দিন তাকে মানসিক বিষণ্ন দেখেননি। মেয়ে ছিল তার প্রাণ। তার আশা ছিল মেয়ে বড় ডাক্তার হবে। অনটনের মধ্যে মেয়ের মেডিক্যালে ভর্তির টাকার জন্য জমি বিক্রি করতে চেয়েছিল। ঘটনার রাতে বড় ভাই দেলোয়ারের বাসায় সবাই মিলে দাওয়াত খেয়েছিল। রাত ১১টা পর্যন্ত ওই বাসায় ছিল। আর পরের দিন সকালে ঘরে তাদের লাশ পাওয়া গেছে। মানসিক সমস্যা থাকলে দাওয়াত খায় কিভাবে? সে মানসিক বিষণ্নতায় ভুগছিল—এ কথা মানতে পারছি না।’

আরেক প্রতিবেশী রফিক উদ্দিন ও সাহেলা বেগম বলেন, ‘কামাল মানসিক বিষণ্নতায় ভোগবে কেন? ওর তো সুখের সংসার ছিল। মেয়ে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি, এসএসসি ও এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়ে পাস করেছিল। যে বাবা মেয়ের লেখাপড়ার জন্য জমি বিক্রি করে টাকা দেয় সে কেন তাকে এবং স্ত্রীকে খুন করবে? নিজে আত্মহত্যা করবে? এটা কখনোই হতে পারে না। এ হত্যায় অন্য কেউ জড়িত। শুধু আমরা নই, এলাকার কেউ এ কথা বিশ্বাস করছে না। বরং আমরা জানি মামলার বাদী কামালের বাবার মানসিক সমস্যা রয়েছে। তিনি কখন কী বলেন ঠিক নেই।’

কামালের স্ত্রীর বড় ভাই আমিন উদ্দিন জানান, কামাল প্রেম করে তাঁর বোন নাজমাকে বিয়ে করায় বাবা-মা ও ভাই-বোনেরা তাঁর বোনকে ২৪-২৫ বছরেও মেনে নেয়নি। যে কারণে পৈতৃক জমিও তাকে দেওয়া হয়নি। বোন নাজমার ওয়ারিশের জমি বিক্রির টাকা দিয়ে তারাই কামালের বাড়িটি করে দিয়েছিলেন। তাদের পুরো জমি ভোগ করতেন বড় ভাই দেলোয়ার হোসেন। ঘটনার দুই দিন আগেও জমির ভাগ চাওয়ায় ভাই ও মায়ের সঙ্গে কামালের ঝগড়া হয়। পরে ভাগের জমি কেনা ও টাকা দেওয়ার কথা বলে ওই রাতে কামালের পরিবারকে দাওয়াত করেন বড় ভাই। ওই রাতেই তারা খুন হয়। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

তিনি আরো জানান, মৃত্যু সংবাদ তাদের জানানো হয়নি। লাশ নিতেও মর্গে যায়নি কামালের পরিবারের সদস্যরা। আবার তাড়াহুড়ো করে কামালকেই হত্যাকারী বানিয়ে মামলা করাটাও নানান রহস্যের জন্ম দিয়েছে। হয়তো হত্যার আগে তাদের নেশাযুক্ত কিছু খাইয়ে অচেতন করা হয়েছিল এবং পরে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।

আমিন উদ্দিন আরো জানান, এ ঘটনায় তিনি গতকাল সকালে মামলা করতে জয়দেবপুর থানায় গিয়েছিলেন। কিন্তু নিহতের বাবা আগেই মামলা করায় ওসি মামলা নেননি। তিনি এ ঘটনায় আদালতে মামলা করবেন।

কামালের বড় ভাই দেলোয়ার হোসেন জানান, তাঁদের দুই ভাইয়ের মধ্যে কোনো খারাপ সম্পর্ক ছিল না। সব জমিই তাঁর বাবার। তিনি জমিজমা দখল করেননি। তাঁর বিরুদ্ধে ভাইয়ের সঙ্গে শত্রুতার অভিযোগ সত্য নয়।

কামালের বাবা হাশেম মিয়া বলেন, তাঁর দুই ছেলের মধ্যে কোনো শত্রুতা ছিল না।

এদিকে গতকাল র‌্যাব, পিআইবি ও সিআইডি পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। র‌্যাবের গাজীপুর ক্যাম্পের কম্পানি কমান্ডার মহিউল ইসলাম বলেন, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় তাঁরাও ছায়া তদন্ত শুরু করেছেন।

জয়দেবপুর থানার ওসি আমিনুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় কামালের বাবা হাশেম মিয়া বাদী হয়ে ছেলের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তে অন্য কিছু পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

 



মন্তব্য