kalerkantho


ঘরে মা-মেয়ে, বারান্দায় বাবার লাশ

ময়নাতদন্তে হত্যার প্রমাণ

আলাদা দাফন সম্পন্ন, মামলার প্রস্তুতি

নিজস্ব প্রতিবেদক গাজীপুর   

২১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



গাজীপুরে ঘরের শয়নকক্ষে মা-মেয়ের রক্তাক্ত ও বারান্দা থেকে বাবার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্ত শেষে আলাদা দাফন করা হয়েছে। বাবা কামাল হোসেন ও মেয়ে সানজিদা কামাল রিমির লাশ হায়দারাবাদের নিজ বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে  এবং মা নাজমা আক্তারের লাশ দাফন করা হয়েছে পৈতৃক বাড়ি গাজীপুর শহরের মারিয়ালী এলাকায়। তবে লোমহর্ষক এই মৃত্যুর ঘটনায় গতকাল শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত মামলা হয়নি।

গতকাল দুপুরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক ডা. প্রণয় ভূষণ দাসের নেতৃত্বে তিনজন চিকিৎসক লাশের ময়নাতদন্ত করেন। ময়নাতদন্ত শেষে দুপুর ২টার দিকে পরিবারের সদস্যদের কাছে লাশগুলো হস্তান্তর করা হয়।

ডা. প্রণয় ভূষণ জানান, মা ও মেয়েকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে এটি নিশ্চিত। তবে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এ ময়নাতদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাবা কামাল হোসেন। তাঁকে হত্যা করা হয়েছে, না তিনি আত্মহত্যা করেছেন তা উদ্ঘাটনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য আমরা তিন চিকিৎসক শনিবার (আজ) বৈঠক করব। নিহতের পাকস্থলীর ভিসেরা সংরক্ষণ করা হয়েছে। কেমিক্যাল পরীক্ষার জন্য নমুনা ঢাকায় পাঠানো হবে। আশা করছি দুই সপ্তাহের মধ্যে ভিসেরা রিপোর্ট পাওয়া যাবে। ওই রিপোর্ট পাওয়ার পর ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট করা হবে।

এদিকে তিনজনের লাশ গ্রহণ করতে গতকাল সকাল থেকে মর্গের সামনে অপেক্ষা করছিলেন নিহত নাজমার দুই ভাই আমিন উদ্দিন ও আমজাত হোসেনসহ কয়েকজন নিকট আত্মীয়। দুপুরে ময়নাতদন্তের পর তাঁরা তিনজনের লাশ গ্রহণ করতে চাইলে সেখানে হঠাৎ উপস্থিত হন নিহত কামাল হোসেনের দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়। তিনি কামাল ও তাঁর মেয়ে রিমির লাশ হায়দারাবাদে নিয়ে দাফন করার দাবি জানান। পরে পুলিশের সমঝোতায় বাবা ও মেয়ের লাশ কামালের বড় ভাইয়ের মনোনিত ব্যক্তির কাছে এবং মা নাজমার লাশ তাঁর ভাই আমিন উদ্দিনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

আমিন উদ্দিন জানান, কামালের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া পাঁচ বিঘা জমির পুরোটাই তাঁর বড় ভাই দেলোয়ার হোসেন দখল করে রেখেছেন। এ কারণে তাঁদের সঙ্গে ১৫ বছর ধরে শত্রুতা চলে আসছিল। তাঁদের মধ্যে যাওয়া-আসা, মুখ দেখাদেখিও বন্ধ ছিল। তাঁদের বোন পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমি বিক্রি করে কামালের বাড়ির কাছে জমি কিনে বাড়ি করে। কষ্টে কামাল সংসার চালাতেন এবং মেয়েকে লেখাপড়ার খরচ দিতেন। তাঁরা কিছু কিছু সহযোগিতা করতেন। মা নাজমা ও বাবা কামালের স্বপ্ন ছিল মেয়েকে ডাক্তার বানানোর।

মেয়ে রিমি গত বছর মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ২ নম্বর কম পাওয়ায় সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে পারেনি। টাকার জন্য বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজেও ভর্তি হতে পারেনি। সে আগামী ভর্তি পরীক্ষার জন্য ঢাকায় কোচিং করছিল। তার পরও যদি বেসরকারি মেডিক্যালে ভার্তি হতে হয় তার জন্য সম্প্রতি বড় ভাইয়ের কাছে এক বিঘা জমি চান কামাল। বড় ভাই পাঁচ লাখ টাকা দিতে রাজি হয়েছিলেন। গত বুধবার তাঁরা সবাই দেলোয়ারের বাড়িতে দাওয়াত খেতে যান। ওই রাতেই খুন হন তাঁরা। বিষয়টি বড় চিন্তার। কারণ কামালের লাশের গলায় রশি লাগানো অবস্থায় থাকলেও পা মাটিতে লাগানো ছিল। পা মাটিতে থাকা অবস্থায় ফাঁস লাগতে পারে না। তা ছাড়া নির্মম এ ঘটনার খবর কামালের আত্মীয়রা তাঁদের জানায়নি। লোকমুখে শুনে বৃহস্পতিবার মর্গে আসেন তাঁরা। তারপর থেকে লাশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

তিনি আরো জানান, কিন্তু গতকাল সকালে হঠাৎ কামালের বড় ভাইয়ের মনোনিত এক লোক এসে কামাল ও রিমির লাশ নিয়ে যায়। তাঁর বোন, ভাগ্নি ও বোনজামাইকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে সন্দেহ করেন আমিন উদ্দিন। এ ঘটনায় কামালের ভাইয়ের পরিবারের কেউ এখনো মামলাও করেনি। কামাল স্ত্রী ও সস্তানকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছে বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে তারা। তাঁরা এটা বিশ্বাস করেন না। কারণ কামাল স্ত্রী-সন্তানদের অনেক ভালোবাসতেন। মেয়ে ছিল তাঁর প্রাণ। তিনি জানান, বাদী হয়ে এ ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

জয়দেবপুর থানার ওসি আমিনুল ইসলাম জানান, তিন মৃত্যুর ঘটনায় কেউ মামলা করেনি। লাশ দাফনের পর হয়তো তাঁরা অভিযোগ দিবেন। অভিযোগের পর তদন্ত শুরু হবে। তদন্তের পর প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে।



মন্তব্য