kalerkantho


মাদকের রুটে গড়ে উঠছে পর্যটনকেন্দ্র

আরিফুর রহমান; টেকনাফ থেকে ফিরে   

২১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



ওপারে মিয়ানমার, এপারে বাংলাদেশ। মাঝখানে নাফ নদ। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নাফ নদের মাঝখানে প্রায় ৩০০ একর জুড়ে গড়ে ওঠা ছোট্ট একটি দ্বীপ; স্থানীয়রা যাকে চেনে জালিয়ার দ্বীপ নামে। বছরের পর বছর ইজারা ফি না দিয়ে দ্বীপটি অবৈধভাবে নিজেদের কবজায় ধরে রেখেছিল একটি গোষ্ঠী। আইনিপ্রক্রিয়া শেষে এটি দখলমুক্ত হওয়া অপার সৌন্দর্যের দ্বীপটিকে আন্তর্জাতিকমানের পর্যটন পার্কে রূপ দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)।

ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ২৭১ একর জমি বুঝে পাওয়ার পর দ্বীপটির নতুন নাম দেওয়া হয়েছে ‘নাফ পর্যটন অঞ্চল’। পর্যটনের অপার সম্ভাবনা নাফ পর্যটন অঞ্চলের ভূমি উন্নয়নে দিন-রাত কাজ করছে আড়াই শ শ্রমিক। শ্রমিকদের দম ফেলার ফুরসত নেই। কারণ মাটি ভরাটের কাজ শেষ করতে হবে আগস্টের মধ্যে। দ্বীপের ভেতর ১৪টি পুকুর ছিল; যেখানে অবৈধভাবে চিংড়ি ও লবণ চাষ করা হতো। নাফ নদ থেকে চারটি জাহাজে করে বালু তুলে পাইপলাইনের মাধ্যমে সেগুলো এরই মধ্যে ভরাট করা হয়েছে। তিন কোটি ঘনফুট লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে এরই মধ্যে আড়াই কোটি ঘনফুট বালু ফেলা হয়েছে। বাকি ৫০ হাজার ঘনফুট ফেলা হবে আগস্টের মধ্যে। দ্বীপের ভেতর পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার কাজও চলছে জোরোশোরে। সরেজমিন ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।

নাফ পর্যটন অঞ্চলের ভূমি উন্নয়নের কাজটি পেয়েছে এমএম বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির সাইট ম্যানেজার ফয়জুল করিম রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দ্বীপের ভেতরে থাকা ১৪টি পুকুর ভরাটসহ পুরো এলাকায় আমাদের ৮০ শতাংশ মাটি ভরাটের কাজ শেষ। আবহাওয়া বৈরী না হলে বাকি ২০ শতাংশ কাজ আমরা আগস্টের মধ্যে শেষ করতে পারব বলে আশা করছি। কাজটি করতে আমাদের এক বছরেরও কম সময় লাগছে।’ তিনি বলেন, ‘একসময় এই দ্বীপ চিংড়ি ও লবণ চাষের পাশাপাশি মাদক আনা-নেওয়ার রুট হিসেবেও ব্যবহৃ ত হতো। কিন্তু সেটা এখন পুরোপুরি বন্ধ।’

প্রস্তাবিত নাফ পর্যটন এলাকায় দেখা হলো আনোয়ার হোসেন নামের এক জেলের সঙ্গে। তিনি বলেন, এই দ্বীপে একসময় সাধারণ কেউ ঢুকতে পারত না। মাদক বিক্রির রুটও ছিল এই দ্বীপ। এখন চাইলে যে কেউ সেখানে যেতে পারে। স্থানীয় আরেক বাসিন্দা আরমান মিয়া বলেন, ‘শুনেছি, জালিয়ার দ্বীপে (নাফ পর্যটন এলাকা) সরকার পর্যটনকেন্দ্র করতে চায়। তবে সেখানে যাওয়ার সুযোগ যাতে সবাই পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।’

বেজার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘নাফ পর্যটন এলাকায়’ পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রাইসওয়াটার হাউসকুপারসকে দিয়ে একটি সমীক্ষা করা হয়েছে। তারা এরই মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তাদের সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে দ্বীপটিকে তৈরি করা হবে অত্যাধুনিক ও আন্তর্জাতিকমানের পর্যটন পার্ক হিসেবে। দেশি ও বিদেশি দুই ধরনের পর্যটকের কথা মাথায় রেখেই নাফ পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। এটিকে কিভাবে আকর্ষণীয় করে তোলা যায়, সেটি নিয়ে আলাদা একটি সমীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয় ভারতীয় প্রতিষ্ঠান মাহিন্দ্রকে। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

বেজার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানা গেছে, নদীবেষ্টিত বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পর্যটকদের দুইভাবে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকছে। কেউ চাইলে অদূরে নে টং পাহাড় থেকে কেবল কারে করে দ্বীপে যেতে পারবে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের আদলে কেবল কার সুবিধা রাখা হচ্ছে। অন্যভাবে দ্বীপের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য নাফ নদের ওপর একটি ঝুলন্ত সেতু তৈরি করা হবে। দ্বীপের ভেতরে থাকবে রিসোর্ট, ক্যাসিনোসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্বীপের চারপাশে নির্মাণ করা হবে সীমানা দেয়াল। ভেতরে নির্মাণ হবে সংযোগ সড়ক।

বেজার কর্মকর্তারা জানান, মূল সড়ক থেকে দ্বীপে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে বাড়তি ২১ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। নাফ নদের নিচ দিয়ে বিদ্যুতের লাইন নেওয়ার কাজও প্রায় শেষ। দ্বীপের ভেতরে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কাজ শুরু করেছে। নে টং পাহাড় থেকে নাফ অঞ্চলে কেবল কার নেওয়ার সম্ভাব্যতার কাজ দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (চুয়েট)। বাংলাদেশে এর আগে এ ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা আছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের। ২৭১ একর জায়গার মধ্যে ৫০ একর জায়গা রাখা হবে বন্য প্রাণী ও পাখিদের আবাসস্থল হিসেবে।

বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নাফ এলাকাকে আমরা আন্তর্জাতিকমানের একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। নাফ পর্যটনকেন্দ্র হবে অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক দ্বীপ। যেখানে পর্যটকদের জন্য সব ধরনের সুবিধা থাকবে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে আমরা পর্যটনকেন্দ্র সাজাব। আমরা ৫০ একর জায়গা রাখব পাখি ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে। সেখানে থাকবে কেবল কার ও ঝুলন্ত সেতু। পর্যটকরা চাইলে নাফ পর্যটন এলাকা ঘুরে পাশে সেন্ট মার্টিনসওে যেতে পারবে।’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে টেকনাফ উপজেলায় ২৭১ একর আয়তনের জালিয়ার দ্বীপে ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে অবৈধভাবে চিংড়ি ও লবণ চাষ করে আসছিল একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী। মেসার্স জালিয়ারদিয়া লিমিটেডের নামে সরকারের কাছ থেকে ১০ বছরের জন্য জমি ইজারা নিলেও গোষ্ঠীটি ইজারা ফি পরিশোধ করেনি। বকেয়া পরিশোধে বারবার তাগিদ দিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি। একপর্যায়ে সরকার জমির ইজারা বাতিল করলে এর বিরুদ্ধে দুটি রিট করেন শামসুল আলম নামের একজন। আলী আকবর, ফিরোজ আহমেদ, খোরশেদ আলম, আবু তালেব, মোহাম্মদ আইয়ুব, আবুল কাশেমসহ অনেকে ওই জমিতে চিংড়ি ও লবণ চাষের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সব পক্ষের বক্তব্য শুনে রিট দুটি খারিজ করে দেন আদালত। মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার পর ভূমি মন্ত্রণালয় ২৭১ একর জমি বেজার অনুকূলে বন্দোবস্ত করে দেয়। সেখানেই এখন চলছে পর্যটনকেন্দ্র তৈরির কাজ। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পরিচালক আব্দুস সবুর মণ্ডল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নাফ পর্যটনকেন্দ্রের কাজ শেষ হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে টেকনাফ হবে অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। দ্বীপটি অত্যন্ত চমৎকার এবং সম্ভাবনাময় এলাকা। আমরা বেজার কাছে জমি চাইব। বেজার কাছ থেকে জমি পেলে সেখানে আমরা পর্যটকদের জন্য হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ সব ধরনের সুযোগ সুবিধা রাখব। পর্যটকদের চাহিদার কথা মাথায় নিয়ে আমরা উন্নয়ন করব।’ তাঁর মতে, পর্যটকেন্দ্রটি হয়ে গেলে টেকনাফ ও আশপাশের এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে।



মন্তব্য