kalerkantho


কিডনি প্রতিস্থাপন

দেশে প্রথম ‘এবিওআই’ পদ্ধতির সফল প্রয়োগ

আতাউর রহমান কাবুল   

২০ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



দেশে প্রথম ‘এবিওআই’ পদ্ধতির সফল প্রয়োগ

কুড়িগ্রামের ২৩ বছর বয়সী ইমরান ফিরোজের দুটো কিডনিই বিকল। তাঁর রক্তের গ্রুপ ‘ও’। চিকিৎসকের পরামর্শ, ইমরানকে বাঁচাতে অবিলম্বে প্রয়োজন কিডনি প্রতিস্থাপনের। ছেলেকে বাঁচাতে নিজের কিডনি দিতে চান ইমরানের মা। কিন্তু বিধি বাম! দুজনেরই রক্তের গ্রুপ আলাদা। কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য কিডনিদাতার সঙ্গে রোগীর রক্তের গ্রুপ ও টিস্যু টাইপিংয়ের যথেষ্ট মিল থাকাই নিয়ম। তবে আশার কথা হলো, ইমরান ফিরোজের ক্ষেত্রে অন্য দাতা খুঁজতে হয়নি। রক্তের গ্রুপ আলাদা হওয়া সত্ত্বেও অবশেষে মা পেরেছেন নিজের ছেলেকে কিডনি দিতে।

গত ৫ জুলাই এবিও ইনকমপ্যাটিবল ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন (এবিওআই) পদ্ধতিতে দেশে প্রথমবারের মতো কিডনি প্রতিস্থাপন করা হলো ঢাকার কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে। এর মধ্যে ইমরান ও তাঁর মা হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়ে বাসায় গেছেন এবং ভালো আছেন বলে জানা গেছে।

কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আর রশিদের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ নেফ্রোলজি টিম, ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন অধ্যাপক ডা. খুরশিদুল আলম ও অধ্যাপক ডা. সাজিদ হাসানের নেতৃত্বে ট্রান্সপ্লান্ট টিম, ব্লাড ব্যাংক স্পেশালিস্ট, অ্যানেসথেসিস্ট ও নার্সের সমন্বয়ে বিশেষ টিম এই কিডনি প্রতিস্থাপন কার্যক্রম পরিচালনা করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মাধ্যমে কিডনি সংযোজনে ঘটল যুগান্তকারী ঘটনা, বাংলাদেশ পৌঁছল নতুন উচ্চতায়। এখন আর রোগীর সঙ্গে কিডনিদাতার রক্তের গ্রুপের মিল নিয়ে ভাবতে হবে না। আর আধুনিক ‘এবিওআই’ পদ্ধতির ব্যবহার নিয়মিত সম্ভব হলে কিডনিদাতার সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে, সমাধা হবে দাতা সংকটের। পাশাপাশি অনেকাংশেই কমে যাবে কিডনি বেচা-কেনার মতো গর্হিত কাজ।

সাধারণত রক্তদান আর কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নিয়ম একই। ‘ও’ এবং ‘এবি’ গ্রুপ ছাড়া (‘ও’ গ্রুপ সর্বজনদাতা এবং ‘এবি’ গ্রুপ সর্বজনগ্রহীতা) এক রক্তের গ্রুপের ব্যক্তিই সেই রক্তের গ্রুপধারী অন্য ব্যক্তিকে রক্ত দিতে পারেন। কিডনি সংযোজনের ক্ষেত্রেও নিয়মটা একই, যাকে বলে ‘এবিও কমপ্যাটিবল’ কিডনি প্রতিস্থাপন। এই পদ্ধতিতে কিডনি প্রতিস্থাপনের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে ‘প্লাজমাফেরেসিস’ পদ্ধতিতে রক্তের প্লাজমা বা রক্তরসকে রক্তকোষ থেকে আলাদা করা হয়। একটি ছাঁকনির মাধ্যমে বারবার ছেঁকে সেখান থেকে অ্যান্টিবডিগুলো আলাদা করা হয়। আর অ্যান্টিবডি আলাদা করলে অন্য রক্তের গ্রুপের কোনো ব্যক্তির কিডনি প্রতিস্থাপন করার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা থাকে না। ইমরান ফিরোজের এন্টিবডি ছিল ১ : ১২৮ যা ব্লাড এফেরেসিস মেশিনের মাধ্যমে ও কিছু ওষুধ প্রয়োগ করে ১:৮-এ নামিয়ে আনা হয়। পুরো প্রস্তুতি শেষ হতে সময় লাগে তিন সপ্তাহ। এর পরই প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়।

অধ্যাপক ডা. হারুন আর রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, উন্নত বিশ্বে এই প্রক্রিয়ায় (এবিওআই) কিডনি প্রতিস্থাপনের সাফল্যের হার প্রায় ৯৫ ভাগ। স্বাভাবিক প্রতিস্থাপনের রোগীদের মতো তাদের ক্ষেত্রেও ইনফেকশন ও কিডনি রিজেকশন ছাড়া অন্য তেমন কোনো ঝুঁকি নেই। তবে প্রতিস্থাপনের পর বিশেষ ফলোআপে থাকতে হয় কিছুদিন। তিনি জানান, কিডনি ফাউন্ডেশনে প্রতিস্থাপন বাবদ খরচ হয় দুই লাখ ৬০ হাজার টাকার মতো। এই রোগীর ক্ষেত্রে সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে সাড়ে আট লাখ টাকার মতো। তবে রোগীর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা, বাকিটা কিডনি ফাউন্ডেশন বহন করেছে।

উল্লেখ্য, দেশে প্রায় দুই কোটি লোক কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। এরমধ্যে প্রতিবছর সম্পূর্ণভাবে কিডনি বিকল হয় প্রায় ৪০ হাজার রোগীর, যাদের ৮০ শতাংশই মারা যায়। বাকি ২০ শতাংশের মধ্যে ৯৫ ভাগ হেমো ডায়ালিসিস ও দুই থেকে আড়াই ভাগ সিএপিডি ও কিডনি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে বেঁচে থাকে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে দুই হাজারের বেশি রোগীর কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে যাদের সবই জীবিত এবং আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে নেওয়া।



মন্তব্য