kalerkantho


শিক্ষা খাতে উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি

শরীফুল আলম সুমন   

২৬ মে, ২০১৮ ০০:০০



চলতি অর্থবছর শেষ হতে দুই মাসেরও কম সময় বাকি। কিন্তু ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের আওতাধীন ১৪ প্রকল্পে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) বরাদ্দ অর্থের মধ্যে গত ১০ মাসে খরচ হয়েছে ৫৮.৯৬ শতাংশ। বাকি দুই মাসে খরচ করতে হবে ৪১.০৪ শতাংশ অর্থ। সারা বছর বসে থেকে শেষ সময়ে প্রকল্প নিয়ে চলছে তাড়াহুড়া। টেন্ডার ছাড়াই বা নামমাত্র টেন্ডারে বড় বড় কাজ দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ আছে। অনেক প্রকল্পে জোগাড় করা হচ্ছে অগ্রিম বিল-ভাউচার। 

মাউশি অধিদপ্তরের জরিপ অনুযায়ীই মাধ্যমিক স্তরের ৫১ শতাংশ শিক্ষক এখনো ঠিকমতো সৃজনশীল বোঝেন না। তাঁরা সৃজনশীল প্রশ্ন করতে পারেন না। এ জন্য প্রশিক্ষণের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে বলেছেন শিক্ষাবিদরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও একই মত। অথচ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও মানোন্নয়নের জন্য নেওয়া টিচিং কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট-২ (টিকিউআই-২) প্রকল্পের অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ। চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে ওই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩৫.৫১ শতাংশ অর্থ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আরএডিপিতে মাউশি অধিদপ্তরের ১৪টি প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল দুই হাজার ৪৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত এপ্রিল পর্যন্ত ৮১.১৮ শতাংশ অর্থ ছাড় করেছে সরকার। কিন্তু ব্যয় হয়েছে ৫৮.৯৬ শতাংশ।

মাউশি অধিদপ্তর সূত্র মতে, সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড একসেস অ্যানহান্সমেন্ট প্রজেক্টে (সেকায়েপ) গত এপ্রিল পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে এডিপির ৯৩.৭১ শতাংশ অর্থ। গত বছর এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তাদের বেশির ভাগ টাকাই খরচ হয়েছে। চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে খরচ হয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় ১১ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ছয় কলেজ প্রকল্পে ৫১.৩১ শতাংশ, জেলা পর্যায়ের সরকারি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট উন্নয়ন প্রকল্পে ৮১.৯১ শতাংশ, টিকিউআই-২ প্রকল্পে ৩৫.৫১ শতাংশ, তথ্য-প্রযুক্তি সহায়তায় বেসরকারি কলেজের উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পে ৮৩.০৪ শতাংশ, সাত সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পে ৭০.৪৪ শতাংশ, সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রগ্রামে (সেসিপ) ৬১.৯৮ শতাংশ, ন্যাশনাল একাডেমি ফর অটিজম অ্যান্ড নিউরোডেভেলপমেন্ট ডিজঅ্যাবিলিটি প্রকল্পে ৬৩.৬৫ শতাংশ, সেকেন্ডারি এডুকেশন স্টাইপেন্ড প্রজেক্টে ০.৬০ শতাংশ, হায়ার সেকেন্ডারি স্টাইপেন্ড প্রজেক্টে ১.১৮ শতাংশ, আইসিটি ফর এডুকেশন ইন সেকেন্ডারি অ্যান্ড হায়ার সেকেন্ডারি লেভেল (ফেজ-২)-এ ১.১৭ শতাংশ, সরকারি কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ তৈরি প্রকল্পে শূন্য শতাংশ, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্পে শূন্য শতাংশ এবং ঢাকার আশপাশে ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পে ১.৯২ শতাংশ অর্থ।

জানা যায়, যেভাবে প্রকল্পগুলোর কাজ হচ্ছে তাতে চলতি অর্থবছরে কোনোভাবেই পুরো টাকা শেষ হওয়া সম্ভব নয়। কারো অতিরিক্ত অর্থ লাগবে কি না তা প্রকল্প পরিচালকদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল মাউশি অধিদপ্তর থেকে। কিন্তু কেউ অতিরিক্ত অর্থ চায়নি। বরং কয়েকজন প্রকল্প পরিচালক কিছু টাকা ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন।

জানা যায়, মাধ্যমিক স্তরের বেশ কিছু প্রকল্প সরাসরি শিক্ষার মানোন্নয়নসংক্রান্ত। বিশেষ করে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে টিকিউআই ও সেসিপ প্রকল্পের। কিন্তু ওই দুই প্রকল্পেই সবচেয়ে বেশি অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এসব প্রকল্প থেকে সবচেয়ে বেশি বিদেশ সফরের আয়োজন করা হয়। অনেক কর্মকর্তাই কাজ ফেলে শুধু বিদেশ সফর নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। এতে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে। টিকিউআই-২ প্রকল্পের আওতায় ন্যাশনাল টিচার এডুকেশন কাউন্সিল (এনটিইসি) গঠন করার কথা ছিল। এই কাউন্সিলের তিনটি প্রধান কাজ হলো—সৃজনশীল নিয়ে কাজ, শিক্ষকদের মানোন্নয়ন এবং এক্সাম স্ট্যান্ডারাইজেশন করা। কিন্তু এখনো এনটিইসি গঠন না হওয়ায় প্রকল্পের মূল কাজই আটকে আছে।

এ ছাড়া সারা বছর অর্থ খরচ না করে শেষ সময়ে কয়েকটি প্রকল্পে তাড়াহুড়া করতেও দেখা গেছে। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে ই-টেন্ডার হওয়া বাধ্যতামূলক সেগুলোও ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে সেসিপ এবং আইসিটি ফর এডুকেশন ইন সেকেন্ডারি অ্যান্ড হায়ার সেকেন্ডারি লেভেল (ফেজ-২)-এ ই-টেন্ডারে অনাগ্রহ দেখিয়ে ওপেন টেন্ডারে কাজ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। অভিযোগ উঠেছে, মূলত শেষ সময়ে তাড়াহুড়ার সুযোগ নিয়ে কিছু প্রকল্প পরিচালক পছন্দের লোককে কাজ দিতে চান। এ জন্য তাঁরা ই-টেন্ডারিংয়ে অনাগ্রহ দেখান।

মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর মো. মাহবুবুর রহমান অবশ্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার এডিপি বাস্তবায়নের হার বেশ ভালো। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে একাধিকবার বৈঠক করেছি। আগে থেকেই সবাইকে তাগাদা দিয়ে আসছি। আশা করছি এবার শতভাগ অর্থই আমরা ব্যয় করতে পারব। প্রকল্প পরিচালকরাও আমাদের এ ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন। আর কিছু প্রকল্প আছে বিশেষ করে বৃত্তি প্রকল্পের টাকা শেষ সময়েই খরচ করতে হয়।’



মন্তব্য