kalerkantho


আ. লীগে মনোনয়ন লড়াই কোন্দলে দুর্বল বিএনপি

আবদুল হামিদ মাহবুব, মৌলভীবাজার   

২২ মে, ২০১৮ ০০:০০



আ. লীগে মনোনয়ন লড়াই কোন্দলে দুর্বল বিএনপি

শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা নিয়ে মৌলভীবাজার-৪ সংসদীয় আসন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও চা শ্রমিক অধ্যুষিত এই আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। দশটি সংসদের মধ্যে দুটির বিতর্কিত নির্বাচন বাদ দিলে বাকি সব সংসদে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব ছিল। বলা হয়ে থাকে, এই আসনে ভোটাররা প্রার্থী নয়, প্রতীক দেখে ভোট দেয়।

অবশ্য বর্তমানে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অন্য রকম পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পাঁচবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য আব্দুস শহীদের একক আধিপত্য খর্ব হয়ে গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে দলের অন্তত চার নেতা আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচন করার লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন। অন্যদিকে এই আসনে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল বিএনপি কোন্দলের কারণে ক্ষতবিক্ষত। দলের কেন্দ্রীয় নেতা মুজিবুর রহমান চৌধুরী ছাড়াও সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন প্রবাসীসহ আরো চার নতুন মুখ।

আওয়ামী লীগ : ১৯৯১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আব্দুস শহীদ। তিনি সংসদের চিফ হুইপের দায়িত্বও পালন করেছেন। নির্বাচনী এলাকায় দলের তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক প্রভাব রয়েছে মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আব্দুস শহীদের। আগামী নির্বাচনেও সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় আছেন তিনি। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি কেন্দ্রেও যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সদস্য, কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুর রহমান, শ্রীমঙ্গল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সদস্য রণধীর কুমার দেব, সাবেক সিভিল সার্জন ডা. হরিপদ রায় ও শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সংসদ সদস্য আব্দুস শহীদের বিরুদ্ধে রয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতিকে পাশ কাটিয়ে তাঁর ভাই মোসাদ্দেক আহমদ মানিককে দলের কমলগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর আরেক ভাই ঠিকাদার কল্যাণ সমিতি ও জাতীয় উদ্যান লাউয়াছড়া সহব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি, অন্য এক ভাই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। এসব বিবেচনায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সদস্য রফিকুর রহমানকে তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির মানুষ বলে মনে করে দলের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া তিনি দুইবার কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।

চা বাগান শ্রমিকদের সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর নির্বাচিত চা শ্রমিক নেতাদের শ্রীমঙ্গলের ‘লেবার হাউস’ থেকে বিতাড়িত করে নেতৃত্বে বসানো হয়েছিল অন্য পক্ষকে। এর পেছনে সাবেক চিফ হুইপ আব্দুস শহীদের ইন্ধন ছিল বলে চা শ্রমিকদের অনেকে মনে করে। বিতাড়িত শ্রমিক নেতাদের পক্ষে তখন অবস্থান নিয়েছিলেন আব্দুস শহীদের প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী (বর্তমানে প্রয়াত), কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক রফিকুর রহমানসহ অনেকে। চা শ্রমিক ইউনিয়নের গত নির্বাচনে শহীদের অনুসারীদের ভরাডুবি হয়েছে।

রফিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হুইপ থাকাকালে আব্দুস শহীদ নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের সঙ্গে আন্তরিক পরিবেশে মিশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। ২০০৯ সালে চিফ হুইপ হওয়ার পর তাঁর মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। উপেক্ষিত হতে থাকে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। বিএনপি ঘরানার লোকজন তাঁর অতিমাত্রায় প্রিয় হয়ে ওঠে।’ মনোনয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি পাকিস্তান আমল থেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে থেকে আওয়ামী লীগ করেছি। এখনো আমি আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবেই কাজ করে যাচ্ছি। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করব।’

নেতাকর্মীদের অভিযোগ গুরুত্বসহকারে আমলে নিয়ে সংসদ সদস্য আব্দুস শহীদ বলেন, ‘আমি কোনো সময়ই সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারব না। তবে এলাকার মানুষের জন্য সাধ্যমতো কাজ করেছি, করে যাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নির্বাচনমুখী দল। দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশ অনুসারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিশন বাস্তবায়নে তৃণমূল থেকে শুরু করে সর্বত্র কাজ করে যাচ্ছি। মনোনয়ন চাওয়া গণতান্ত্রিক অধিকার। অনেকে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় থাকতে পারেন। সিদ্ধান্ত দেবে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রীর নেতৃত্বে গঠিত মনোনয়ন বোর্ড।’

দলের কোন্দল বিষয়ে আব্দুস শহীদ বলেন, ‘দলে মতভেদ আছে। এটা থাকাটাই স্বাভাবিক। ৫৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে আসছি। আমার সঙ্গে কারো দূরত্ব নেই। তৃণমূল নেতৃবৃন্দসহ জনগণের ভালোবাসায় পাঁচবার এমপি নির্বাচিত হয়েছি।’

শ্রীমঙ্গল উপজেলা আওয়ামী লীগ সদস্য রণধীর কুমার দেব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে পরে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। চা বাগান সংশ্লিষ্ট সংখ্যালঘু নেতা হিসেবে সব মহলে তাঁর রয়েছে গ্রহণযোগ্যতা। গত জাতীয় নির্বাচনেও মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে শামিল হয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। এবারেও তিনি আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কাজ করছেন। অন্যদিকে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নেতৃবৃন্দের সমর্থন রয়েছে তাঁর প্রতি।

রণধীর কুমার দেব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জনগণের জন্য কাজ করছি, জনগণ চায় আমাকে বড় পরিসরে দেখতে। দল কোনো সিদ্ধান্ত দিলে, আমাকে তো সেটা মানতে হবে।’

বিএনপি : সংসদের বাইরে থাকা দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানায়, মৌলভীবাজার-৪ নির্বাচনী এলাকার কমলগঞ্জে বিএনপির রয়েছে দুটি কমিটি। একটি জেলা বিএনপির সভাপতি নিয়ন্ত্রিত। অন্যটি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের অনুসারী। এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেতে দুই পক্ষের অনুসারী একাধিক প্রার্থী রয়েছেন।

প্রার্থী তালিকায় উল্লেখযোগ্যরা হলেন—দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজি মুজিব), জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি শ্রীমঙ্গল পৌরসভার মেয়র মহসিন মিয়া মধু, শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপি সভাপতি আতাউর রহমান ওরফে লাল হাজি, সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব আলী, মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও লন্ডনপ্রবাসী জালাল উদ্দিন জিকু।

কমলগঞ্জ উপজেলা বিএনপির একাংশের একাধিক নেতাকর্মী বলেছে, মুজিবুর রহমান চৌধুরীর কাছে দলীয় নেতাকর্মীর কোনো মূল্যায়ন নেই। তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ‘হাজি মুজিব ফাউন্ডেশনের’ কর্মী ও আওয়ামী লীগের চিহ্নিত কিছু মানুষ। তা ছাড়া তৃণমূল নেতাকর্মীর সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি ঢাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাঁকে ছাড়া অন্য কোনো পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাকে কেন্দ্র যদি মনোনয়ন দেয় তাহলে দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও উজ্জীবিত হবে।

এসব সমালোচনার জবাবে মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘পুলিশের হয়রানির ভয়ে এলাকায় যেতে পারি না। কখনো এলাকায় গেলে পুলিশের গাড়ি আমার কমলগঞ্জের বাড়ি কিংবা শ্রীমঙ্গলের রিসোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। একই সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তারা তাগিদ দেন ওপরের নির্দেশ রয়েছে দ্রুত এলাকা থেকে চলে যেতে হবে। তার পর রয়েছে মামলা-হামলার ভয়।’

তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক ফোনে যোগাযোগ রয়েছে জানিয়ে মুজিবুর রহমান আরো বলেন, ‘আমি ছাড়া এই আসনে বিএনপির আর কে মনোনয়ন পাবে? আওয়ামী লীগ থেকে সুযোগ-সুবিধা নেওয়া বিএনপির কিছু নেতা শহীদ সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আওয়ামী লীগের বি-টিম হিসেবে কাজ করছে।’ দলে কোনো বিরোধ নেই দাবি করে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের সময় আজকের বিরোধীরাও আমাকে ভোট দেবে বলে বিশ্বাস করি।’

অন্যান্য : বিরোধী দল জাতীয় পার্টি মৌলভীবাজার-৪ আসনে প্রার্থী দেবে কি না এখনো নিশ্চিত নয়। কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখায় দলের রাজনীতিও চলছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘মহাজোটের আদলে’।

দলের কমলগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি মো. দুরুদ আলী জানান, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে প্রার্থী দেওয়া হবে কি না। তবে দল এককভাবে নির্বাচন করলে তিনি দলের কাছে মনোনয়ন চাইবেন।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কমলগঞ্জ শাখার সভাপতি আহমদ সিরাজ বলেন, ‘কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল এলাকায় আমাদের ভালো সাংগঠনিক ভিত্তি আছে। কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচনের যে সিদ্ধান্ত হবে আমরা সেভাবেই কাজ করব। নির্বাচনের ব্যাপারে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়।’



মন্তব্য