kalerkantho


গাজীপুর সিটির প্রচারে নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে

এমপিদের সুযোগ নিয়ে ইসির সিদ্ধান্ত এ সপ্তাহেই

কাজী হাফিজ   

২০ মে, ২০১৮ ০০:০০



গাজীপুর সিটির প্রচারে নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে

সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী প্রচার চালানোর সুযোগ দিয়ে চলতি সপ্তাহেই নির্বাচনী আচরণবিধি সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর ফলে আগামী ২৬ জুন হতে যাওয়া গাজীপুর সিটি নির্বাচনে এবং ভবিষ্যতে সব ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রচারের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হতে যাচ্ছে।

এ ছাড়া খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে নির্বাচন কমিশন একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে ২৭ মের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এই কমিটির সদস্যরা আগামীকাল সোমবার খুলনায় যাচ্ছেন।

এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সব সংসদ সদস্যকে প্রচার চালানোর সুযোগ দেওয়া হবে, নাকি সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যরাই শুধু এ সুযোগ পাবেন, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের আইন ও বিধি সংস্কার কমিটি একমত হতে পারেনি। কমিশন বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

ওই কমিটির একজন সদস্য গতকাল শনিবার কালের কণ্ঠকে জানান, শুধু সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যরা এ সুযোগ পেলে গাজীপুর সিটি এলাকার তিনজন সংসদ সদস্যের মধ্যে একজনই নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন। তিনি হচ্ছেন গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. জাহিদ আহসান রাসেল। মন্ত্রী হওয়ার কারণে গাজীপুর-১ আসনের আ ক ম মোজাম্মেল হক ও গাজীপুর-৫ আসনের মেহের আফরোজ এ সুযোগ পাবেন না।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, কমিশনের আইন ও বিধি সংস্কার কমিটি এ সপ্তাহে হতে যাওয়া কমিশনের বৈঠকে তাদের সুপারিশ পেশ করতে যাচ্ছে। তবে এতে সব সংসদ সদস্য, নাকি সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যরা নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারবেন সে বিষয়ে দ্বিমত থাকার বিষয়টি উল্লেখ থাকবে।

কমিটির সদস্যদের এক পক্ষের যুক্তি—সব সংসদ সদস্যকে এ সুযোগ দেওয়া হলে ১৯৯৪ সালে অনুষ্ঠিত মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনের মতো পরিস্থিতি ঘটতে পারে। সেই নির্বাচনের প্রচারে সংসদ সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিতি থাকায় পরিস্থিতি নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সব সংসদ সদস্যকে প্রচার চালানোর সুযোগ দিলে একই পরিস্থিতির আশঙ্কা আছে।

অন্য পক্ষের যুক্তি—সংসদ সদস্যরা অফিস অব প্রফিট বা প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত নন। অন্যান্য নাগরিকের মতো তাঁদেরও নির্বাচনী প্রচার চালানোর অধিকার রয়েছে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের পদটি লাভজনক এবং তাঁরা সরকারি সুবিধাভোগী নয় বলেই অনেকের ধারণা। তাঁরা কোনো অফিসও হোল্ড করেন না। তাঁদের ব্যক্তিগত সচিবও নেই। এর পরও ২০১৬ সাল থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রচারণায় তাঁদের নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে আইন ও বিধি সংস্কার কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’

প্রসঙ্গত, গত ১৩ এপ্রিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদার সঙ্গে বৈঠকে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল এ বিষয়ে নির্বাচনী আচরণবিধি সংশোধনের দাবি জানায়। এরপর গত ১৯ এপ্রিল বিকেলে এ দাবির বিষয়ে বৈঠক করে কমিশন। বৈঠকে একজন নির্বাচন কমিশনার এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বলেন, সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী প্রচারণার সুযোগ দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে। অন্য একজন কমিশনার সব সংসদ সদস্যকে এ সুযোগ দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেন। এর পরও সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে সংসদ সদস্যদের প্রচারের সুযোগ দেওয়ার পক্ষেই কমিশনের সিদ্ধান্ত হয়। কমিশনের আইন ও বিধি সংস্কার কমিটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানমকে এ বিষয়ে সুপারিশ প্রস্তুত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সিটি করপোরেশন (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা ২০১৬-এর ২(১৩) ধারায় সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সংজ্ঞা দেওয়া আছে। এতে বলা হয়েছে ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ অর্থ প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, সরকারের মন্ত্রী, চিফ হুইপ, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী বা তাঁদের সমপদমর্যাদার কোনো ব্যক্তি, সংসদ সদস্য এবং সিটি করপোরেশনের মেয়রকে বোঝাবে। আর এ বিধিমালার ২২ ধারায় বলা হয়েছে—১. সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচনপূর্ব সময়ে নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণায় বা নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। তবে শর্ত থাকে যে এ ধরনের ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার ভোটার হলে তিনি শুধু ভোট দেওয়ার জন্য কেন্দ্রে যেতে পারবেন।

ইসি সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, এই বিধি অনুসারে সিটি করপোরেশন এলাকার সংসদ সদস্যদের নিজ এলাকায় অবস্থান করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। কিন্তু ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’র সংজ্ঞা থেকে সংসদ সদস্যদের বাদ দেওয়া হলে তাঁরা নির্বাচনী প্রচারণাতেও অংশ নিতে পারবেন।

নির্বাচন কমিশনের আগের তফসিল অনুসারে গত ১৫ মে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সাভারের শিমুলিয়া ইউনিয়নের ছয়টি মৌজা সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৬ মে নির্বাচনের তফসিলের কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন হাইকোর্ট। এই আদেশের বিরুদ্ধে এ নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীরা এবং নির্বাচন কমিশন আলাদা তিনটি আবেদন করে। শুনানি শেষে গত ১০ মে আপিল বিভাগ এই নির্বাচন নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ স্থগিত করে ২৮ জুনের মধ্যে ভোট গ্রহণ করতে বলেন। এরপর গত ১৩ মে নির্বাচন কমিশন আগামী ২৬ জুন এ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ এবং ১৮ জুন থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরুর তারিখ নির্ধারণ করে দেয়।

খুলনার অনিয়ম তদন্তে কমিটি : এদিকে নির্বাচন কমিশন খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনটি কেন্দ্রে অনিয়ম তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব খান মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে কমিটির অন্য দুই সদস্য হচ্ছেন উপসচিব ফরহাদ আহমেদ ও সিনিয়র সহকারী সচিব শাহ আলম।

অনিয়মের অভিযোগ থাকা কেন্দ্র তিনটি হচ্ছে—সরকারি ইকবালনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র এবং লবণচারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে জোর করে সিল মারার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার জন্য কেন্দ্রগুলোতে ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ বলেন, নির্বাচন কমিশন এই তিন কেন্দ্রে কারা, কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।


মন্তব্য