kalerkantho


যে কারণে আন্দোলন জমাতে পারছে না ঢাকা মহানগর বিএনপি

ক্ষোভ বাড়ছে, হতাশ নেতাকর্মীরা

শফিক সাফি   

২০ মে, ২০১৮ ০০:০০



দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা যখন দেশজুড়ে আন্দোলনকে তুঙ্গে নিয়ে গেছে, তখন মাঠে খুঁজে পাওয়া যায়নি ঢাকা মহানগর বিএনপি নেতাদের। ওই আন্দোলনে অচল করে দেওয়া হয়েছিল দেশ। অথচ নেতাদের ব্যর্থতায় সচল ছিল রাজধানী। তখন দলটির সকল পর্যায় থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল, মহানগর বিএনপির নেতৃত্বে থাকা নেতারা যোগ্য নন। এ অবস্থায় আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হাইকমান্ড অবিভক্ত মহানগর বিএনপিকে উত্তর ও দক্ষিণ অংশে ভাগ করে দুটি নতুন কমিটি করে দেয়। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আন্দোলনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, দায়িত্বশীলদের উদাসীনতায় নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ-হতাশাও বাড়ছে। কবে নাগাদ কমিটি পূর্ণাঙ্গ হবে তা নিয়েও অনিশ্চয়তা কাটেনি। পদপ্রাপ্তদের অধিকাংশ কারাগারে নতুবা পালিয়ে। অন্যদিকে পদহীন নেতারা আন্দোলনের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে নেতৃত্ব সংকট। এমন বাস্তবতায় বিএনপির ঘোষিত কর্মসূচিগুলো জমাতে পারছেন না দায়িত্বপ্রাপ্তরা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আন্দোলন জমাতে পারবেন কি না এ সংশয় সৃষ্টি হয়েছে দায়িত্বপ্রাপ্তদের নিয়ে।

দলটির বেশ কজন নেতার মতে, মহানগরের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে দলের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা মির্জা আব্বাস ও সাদেক হোসেনকে নেতৃত্বে এনেও সফল হননি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এ অবস্থায় পুরনো কমিটির সাংগঠনিক ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে গত বছরের ১৮ এপ্রিল প্রথমবারের মতো মহানগরকে দুই ভাগ করে উত্তরে এম এ কাইয়ুম-আহসান উল্লাহ হাসান এবং দক্ষিণে হাবিব উন নবী খান সোহেল-কাজী আবুল বাশারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। নতুন এই নেতৃত্বকে ঘিরে হাইকমান্ডের প্রত্যাশা বাড়তে থাকে। তাদের প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল সংগঠন গোছানো, কিন্তু তা হয়নি। এক মাসের মধ্যে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার কথা বলা হলেও দক্ষিণের ৭০ সদস্যের আংশিক কমিটি এবং উত্তরে ৬৬ সদস্যের আংশিক কমিটির কোনোটিই পূর্ণাঙ্গ করতে পারেননি দায়িত্বপ্রাপ্তরা। দীর্ঘ সময়েও কমিটি না হওয়ায় পদহীন নেতারা এখন কর্মসূচিবিমুখ। আবার পদ নিয়ে ‘ডুব’ মেরেছেন অনেক নেতা। এ অবস্থায় উত্তর কমিটি যুবদলের এবং দক্ষিণ কমিটি স্বেচ্ছাসেবক দলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। পদহীনরা উভয় কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কাছে লিখিত আবেদন করেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করাতে পারেননি। যদিও উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির একাধিক সূত্র বলছে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ার আগেই পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা তাঁর কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি কারাগারে যাওয়ায় তা আর ঘোষণা করা যায়নি। কমিটি ঘোষণার জন্য এর পর মহানগরের শীর্ষস্থানীয় নেতারা দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করলেও দলের প্রধানের অবর্তমানে কমিটি ঘোষণা দেওয়া ঠিক হবে না বলে জানিয়েছেন তাঁরা। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকেও জানানো হয়েছে খালেদা জিয়ার অবর্তমানে কমিটি ঘোষণা করা হলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বেড়ে যাবে।

সূত্রগুলো বলছে, উত্তরে ৬৬ ও দক্ষিণে ৭০ সদস্যের কমিটি থাকলেও সাংগঠনিক কাজে দক্ষ এবং ত্যাগী নেতার সংখ্যা কম। তদবিরে যাদের পদ মিলেছে তারা কর্মসূচিতে নেই আর সক্রিয়দের অনেকে কারাগারে। আবার গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে রয়েছেন একশ্রেণির নেতা। দক্ষিণের সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেল গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে আর উত্তরের সভাপতি গুলশানে তাবিলা হত্যা মামলায় মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছেন দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে গত সপ্তাহে মহানগর দক্ষিণ বিএনপির ১৭ নেতা একসঙ্গে আটক হওয়ায় নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হয়েছে। উত্তরের সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ হাসান গ্রেপ্তার এড়িয়ে কাজ করার চেষ্টা করছেন। অন্য শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা থাকায় তাঁদের বেশির ভাগ সময় আদালতের বারান্দায় কাটাতে হচ্ছে। আর পদহীন নেতাদের পরিষ্কার বক্তব্য, পদ ছাড়া সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া সম্ভব নয়।

কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়াও মহানগরের থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটির অবস্থা আরো বেহাল। রাজধানীর ৪৯টি থানার প্রায় অর্ধেকে কমিটি রয়েছে। এসব কমিটির বয়স ২০ থেকে ২৫ বছর। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর পর কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠন করার কথা।

১৯৯৯ সালে গঠন করা হয় খিলগাঁও ও সবুজবাগ থানা কমিটি, ১৯৯৭ সালে গঠন হয় মতিঝিল ও কোতোয়ালি থানা কমিটি, ২০০৬ সালে গঠিত হয় ডেমরা থানা কমিটি, কামরাঙ্গীরচর থানা কমিটি গঠিত হয় ২০০০ সালে, ২০০৪ সালে হয় ক্যান্টনমেন্ট থানা কমিটি, ২০০১ সালে বাড্ডা ও গুলশান থানা কমিটি গঠন করা হয়। গুলশান থানা কমিটির সভাপতি আনোয়ার হোসেন (বীরপ্রতীক) ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ায় ১১ বছর ধরে সভাপতির পদ শূন্য রয়েছে ওই থানায়। পল্লবী থানা কমিটি হয় ২০০৫ সালে। এখলাস উদ্দিন মোল্লা ছিলেন ওই কমিটির সভাপতি। ২০০৬ সালে তিনিও আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। এ থানায়ও এরপর সভাপতির পদ শূন্য রয়েছে। ১৯৯২ সালে এহসানুল হক সেতুকে সভাপতি ও এস এম গোলাম কিবরিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হয় মোহাম্মদপুর থানা কমিটি। এরপর ১৯৯৮ সালে আফজালুল হককে আহ্বায়ক করে ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দেয় মহানগর শাখা। এ থানায় শুক্রাবাদের সাবেক কমিশনার আব্দুল লতিফকে প্রধান সমন্বয়কারী করে ২০১২ সালে একটি পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়, যা এখন কার্যকর নেই। ১৯৯৮ সালে তেজগাঁও থানা কমিটি হয়। মিরপুর থানা কমিটি হয় ২০০৫ সালে সৈয়দ বদরুল আলম বাবুলকে সভাপতি করে। বদরুল আলম বাবুল দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। প্রশাসনিক ৯০টি ওয়ার্ডের বেশির ভাগের হালনাগাদ কোনো কমিটি নেই।

জানতে চাইলে মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকে সরকার নানাভাবে ব্যস্ত রেখেছে। তাও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে চেয়ারপারসনের কাছে পূর্ণাঙ্গ কমিটির খসড়া জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তা তিনি ঘোষণা করতে পারেননি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি ছাড়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার চেষ্টা করা হলে মহানগর বিএনপি তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে মাঠে থাকবে।

 



মন্তব্য