kalerkantho


হারিয়ে যাচ্ছে হাওরের সুগন্ধি দেশি ধান

‘উফশীর তুলনায় ফলন কিছুটা কম হলেও দাম পাওয়া যায় বেশি। এটা বন্যার ঝুঁকিমুক্তও’

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

২০ মে, ২০১৮ ০০:০০



‘দেশি ধানের ছাউলের বাতের মজা জিফরায় (জিহ্বায়) লাগি থাখত। খাউয়ায় রুচিও আইন্যা দিত। যেকুনু তারাকারি দিয়া মজায় মজায় খাওয়া যায় দেশি ছাউলের বাত।’

হারিয়ে যাওয়া দেশি ধানের স্মৃতিচারণা করে এভাবেই আক্ষেপের সুরে বলছিলেন দিরাই উপজেলার ধল এলাকার সত্তরোর্ধ্ব কৃষক মো. উরফত উল্লাহ। প্রবীণ কৃষকদের স্মৃতিতে এখনো তাজা হাওরের সুস্বাদু ও সুগন্ধি জগলি বোরো, ঝরাবাদল, বাঁশফুল, বর্ণজিরা, তুলসীমালা, গাজী, জোয়ালকোট, মধুমাধব, খাসিয়া বিন্নি, হলিনদামেথি, দুধজ্বর ধান। স্থানীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বকারী এসব ধান হারিয়ে যাচ্ছে।

কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, দেশি ধানের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যেমন বেশি তেমনি বন্যার ঝুঁকিমুক্তও। তা ছাড়া ফলন কম হলেও স্বাদ ও অপূর্ব গন্ধের কারণে এই ধানের চালে বেধি দাম পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষকরা জানায়, স্বাধীনতার পর সবুজ বিপ্লব আন্দোলনের মাধ্যমে অস্তিত্ব হারাতে শুরু করে দেশি ধান। ঝড়-বানের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা এই ধান হাওরের কৃষকের ভরসা ও শক্তির প্রতীক হলেও বেশি ফলনের কথা বলে সরকারি-বেসরকারিভাবে উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ধান চাষ করা হচ্ছে চার দশক ধরে। তবে ফলন বেশি হলেও দেশি ধানের তুলনায় উফশী ধান পাকে দেরিতে। ফলে আগাম বন্যায় প্রতিবছর এই ধানের ক্ষতি হয়। সে তুলনায় অল্প জমিতে কৃষকরা দেশি ধান রোপণ করে লাভবান হচ্ছে। খরচ ছাড়াই চাষকৃত দেশি ধান পানি আসার আগেই কেটে ফেলা যায়। স্থানীয় সূত্র জানায়, ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে অনন্য হাওরাঞ্চলের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হাওর এলাকার কিছু কৃষক আজও দেশি ধান চাষ করছে। চলতি মৌসুমে এই ধান ইতিমধ্যে কেটে ঘরে তুলে নিয়েছে কৃষকরা। ফলনও হয়েছে ভালো, বিঘাপ্রতি প্রায় ১০ মণ উৎপাদন হয়েছে।

স্থানীয় গবেষকরা জানান, দেশে ধান উৎপাদনের বৃহত্তম ভাণ্ডার সুনামগঞ্জ। এখানে কৃষির বড় বাজার রয়েছে। এটাকে টার্গেট করে বহুজাতিক কম্পানিগুলো দেশি ধানকে হটিয়ে নিজেদের বাজার সম্প্রসারণের জন্য কীটনাশক, বীজ বিক্রি করতে নানাভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে। এতে প্রভাবিত হয়ে কৃষকরা এখন দেশি ধানের বদলে হাইব্রিড ধান চাষে মেতেছে।

জেলার মধ্য তাহিরপুর গ্রামের কৃষক গোলাম সরোয়ার লিটন বলেন, ‘দেশি ধান অবহেলার জমিতে বেড়ে ওঠে, পাকে আগে। চাষ করতে কোনো বাড়তি খরচই নেই। সার, কীটনাশক কিছুই লাগে না। এবার আমি প্রায় ৮০ শতক জমিতে দেশি জগলি বোরো চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছি। ধান কেটে চাল করে ইতিমধ্যে খাওয়াও শুরু করেছি। অবশ্য আমার এলাকার অনেক কৃষক আগাম বৃষ্টি-বন্যায় বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এবার বেশ কিছু জমিতে দেশি ধান চাষ করেছে।’

‘হাওর বাঁচাও, সুনামগঞ্জ বাঁচাও’ আন্দোলনের সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, ‘ধান উৎপাদনে দেশের বৃহৎ ভাণ্ডার হাওর। এ কারণে অনেকের কাছেই এটা কৃষির বড় বাজার হিসেবে বিবেচিত। এখানকার বাজার দখলে নিতে দেশি ধানকে হটানোর প্রচারণা শুরু হয় স্বাধীনতার পরপরই। বাণিজ্যিক প্রলোভন ও প্রচারণায় দেশি ধান এখন হারিয়ে গেছে। বেশি ফলনের আশায় আমরা উফশী ধান চাষ করে সার ও কীটনাশকের মাধ্যমে হাওরের জীববৈচিত্র্য নষ্ট করছি। আবার বন্যায় ফসল হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জের হাওর-বাঁওড়ে একসময় প্রায় ২২৮ প্রজাতির বোরো ধান চাষ হতো। খইয়া, রাতা, কন্দী বোরো, জগলি বোরো, বিচিবিরই, বানাজিরা, সাধু টেপি, রংগিলা, নলবিরণ, সোনা রাতা, গচি, বোনাভাতা, লিচুবিরন, লতা বোরো, কইয়া বোরো, লতাটেপি, চন্দ্রী, সাধু, গাচমল, মাশিন, বাঁশফুল, তুলসীমালা, গই বিশাল, ঠাকরি, লালটেপি, গিজাবিরো, বিকিন, গজারি, বর্ণজিরা, কচুশাইল, আসান, অসিম, বিদিন, ফটকা, কাউলি, তায়েফ, রায়েন, বইয়াখাউরি, বেগমপেচিসহ বিভিন্ন দেশি প্রজাতির বোরো ধান চাষ হতো। আমন মৌসুমে দুধজ্বর, বাজলা, মুগি, আশানিয়া, দেপা, বিরল, মোটংগা, আশা, গাজী, খামা, গুতি, কলামখনিয়া, খুকনিশাইল, কইতাখামা, জোয়ালকোট, মাতিয়ারি, আইকর শাইল, ময়নাশাইল, গোয়াই, মুগবাদল, চেংরামুরি, তেরব আলী, কাচালত, ময়নামতি, পানিতারং, চাপলাশ, পানিলড়ি, আশকল, পুঁথিবিরণ, ঝরাবাদল, নাপতা, কটকটিয়া, খইয়া আমন, ডেপা খাগা, কলামাকনি, ধলামাকনি, যদুবিরন, মধুবিরন, মধুবাধব, ফুলমালতি, কলারাজা, খাসিয়াবিন্নি, পুরাবিন্নি, গান্ধি শাইল, হলিনদামেথি, কলাহিরা, সোনাঝুরি, হাতকড়া, ঘোটক, অগি ঘোটক, চাপরাস, নাগা ঠাকুরভোগ, গোয়ারচরা ধান চাষ হতো। এ ছাড়া আউশ মৌসুমে কিছু এলাকায় মুরালি, দুমাই, মারকা, মোরালি, বগি, দোয়ালিসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশি ধান চাষ হতো। কাব্যিক নামের এসব ধান এ অঞ্চলের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতিনিধিত্ব করত।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক স্বপন কুমার সাহা বলেন, সময়ের প্রয়োজনেই উফশী চাষে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আগে লোকসংখ্যা কম ছিল তাই কম উৎপাদনে চলে যেত। এখন লোকসংখ্যা বাড়ছে বলেই কৃষিতে অধিক ফলনের প্রচার চালানো হচ্ছে। তবে এখনো হাওরে আগাম ফলনশীল দেশি ধান চাষ হচ্ছে।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোনমি অ্যান্ড হাওর অ্যাগ্রিকালচার বিভাগের অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘হাওরের হারানো ধানের জাত ফিরিয়ে আনতে আমরা কাজ শুরু করেছি। আমরা ইতিমধ্যে বেশ কিছু হারানো জাত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। বন্যার ঝুঁকিমুক্ত দেশি ধান ফলন

কম হলেও খরচ ছাড়াই পরিবেশসম্মতভাবে চাষ হয়। এতে প্রকৃতির ভারসাম্যও রক্ষা হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশি ধান পুনরুদ্ধারের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছি। এবার পরীক্ষামূলক ধান চাষ করে দেখেছি দেশি ধান ১২-১৫ দিন আগে পাকে।’



মন্তব্য