kalerkantho


মিরপুরের বেনারসিপল্লী যাচ্ছে শিবচর-জাজিরায়

আরিফুর রহমান   

১৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মিরপুরের বেনারসিপল্লী যাচ্ছে শিবচর-জাজিরায়

বেনারসিপল্লী আর ঢাকার মিরপুরে থাকছে না। স্থানান্তর হয়ে যাচ্ছে মাদারীপুরের শিবচর ও শরীয়তপুরের জাজিরায়। নামেও পরিবর্তন আসছে। নতুন নামকরণ হচ্ছে ‘শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী’। সরকারের উদ্যোগে ১২০ একর জায়গার ওপর গড়ে উঠবে পরিকল্পিত এই তাঁতপল্লী। সেখানে তাঁতিদের জন্য থাকবে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা। পুরো প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার কোটি টাকা, যার পুরোটাই রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে জোগান দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের অক্টোবরে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে বেনারসিপল্লীকে ঢাকার বাইরে নিরিবিলি পরিবেশে নেওয়ার নির্দেশ দেন। একই বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তিনি আবারও একই নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনার আলোকে শিবচর ও জাজিরার জায়গাটি নির্বাচন করা হয়। এই জায়গার কিছু খাস ও কিছু ব্যক্তিগত সম্পত্তি। তবে জনবসতি না থাকায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের বিষয়টি থাকছে না। শিবচর ও জাজিরা থেকে ৬০ একর করে জায়গা নিয়ে এই বেনারসিপল্লী স্থাপনের প্রস্তাবে সংশ্লিষ্ট সবাই একমত পোষণ করেন।

তাঁত বোর্ডের প্রধান আইয়ুব আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, শিবচর ও জাজিরায় এই শিল্পসংশ্লিষ্টদের থাকার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে তাঁদের সন্তানদের লেখাপড়া, স্বাস্থ্যব্যবস্থাসহ সব কিছুই সরকার নিশ্চিত করবে।

তাঁত বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে দুই ধাপে। প্রথম ধাপে জমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হবে। আর দ্বিতীয় ধাপে নির্মাণ করা হবে তাঁতিদের থাকার জন্য ফ্ল্যাট, স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট, হাসপাতালসহ অন্যান্য অবকাঠামো। ২০২১ সালের মধ্যে পুরো কাজ শেষ করতে চায় তাঁত বোর্ড। প্রকল্পটি একনেকের সভায় চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের মধ্যেই অনুমোদন পেতে পারে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রস্তাবিত পল্লীতে ৪২টি আবাসিক ভবন নির্মাণ করে সেখানে দুই হাজার ১৬ জন তাঁতির প্রত্যেককে ৮০০ বর্গফুটের একটি করে ফ্ল্যাট দেওয়া হবে। এ ছাড়া ৫০০ কারিগরের বাসোপযোগী ডরমিটরি, একটি রেস্টহাউস, সাইবার ক্যাফে ও পল্লী বিদ্যুতের সাবস্টেশন নির্মাণ করা হবে। থাকবে তথ্যকেন্দ্র ও আনসার ক্যাম্প। পল্লীতে সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন তাঁতপণ্যের হাট বসবে।

তাঁত বোর্ডের ব্যবস্থাপক মনজুরুল ইসলাম জানান, এই প্রকল্পের আওতায় তাঁতিরা তাঁতবস্ত্রের জন্য বিভিন্ন বয়ন-পূর্ব ও বয়ন-উত্তর সুবিধা নিতে পারবে। সেখানে সুতাসহ বিভিন্ন উৎপাদন উপকরণ ও কাঁচামালের মার্কেট এবং ডিসপ্লে সেন্টারও থাকবে। প্রকল্প এলাকায় তাঁতের বুনন থেকে শুরু করে বিপণনের সব ধরনের সুবিধা থাকবে। একই সঙ্গে তাঁতপল্লীতে আট হাজার ৬৪টি তাঁত স্থাপন করা হবে। তিনি বলেন, তাঁতপল্লীটি এমন স্থানে বাস্তবায়িত হচ্ছে, যেখান থেকে পদ্মা সেতু ও পদ্মা রেলস্টেশন থাকবে খুব কাছাকাছি। সে সুবাদে তাঁতিরা উৎপাদিত পণ্য ও কাঁচামাল সহজেই আনা-নেওয়া করতে পারবে।

তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন মিরপুরের বেনারসিপল্লীর উদ্যোক্তা ও তাঁতিরা। এই পল্লীতে অবস্থিত হানিফ সিল্ক ইন্ডাস্ট্রির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ হানিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিরপুরে প্রতিভাবান অনেক বিহারি তাঁতি আছে। তাদেরকে ঢাকার বাইরে ভালো জায়গা করে দিতে পারলে এই শিল্পের জন্য লাভ হবে। কিন্তু তাঁত বোর্ড এর আগে যত উদ্যোগ নিয়েছে তা আলোর মুখ দেখেনি। তাই এবারও তারা পারবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’

তাঁত বোর্ডের প্রধান আইয়ুব আলী জানান, ‘বড় উদ্যোক্তারা হয়তো প্রকল্প এলাকায় যেতে চাইবে না। তবে রাস্তার পাশে কিংবা ঢাকার আশপাশে হলে বিহারি তাঁতীরা সেখানে যেতে রাজি আছে।’

তাঁত বোর্ডের কাগজপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, মিরপুরে বেনারসিপল্লীর তাঁতিদের জন্য ১৯৯৫ সালে ‘বেনারসিপল্লী’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। এর আওতায় ভাসানটেক এলাকায় ৪০ একর সরকারি সম্পত্তিতে ৯০৬টি প্লট তৈরি করা হয় তাঁতিদের জন্য। একই সঙ্গে ভূমি উন্নয়ন ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়। কিন্তু স্থানীয়দের পুনর্বাসন না করে উচ্ছেদের চেষ্টা করা হলে তারা হাইকোর্টে মামলা করে দেয়। আদালতের নির্দেশে শেষ পর্যন্ত স্থগিত হয়ে যায় প্রকল্পের কাজ।


মন্তব্য