kalerkantho


পুলিশের ‘অনুপ্রবেশে’ পণ্ড বিএনপির অবস্থান কর্মসূচি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



পুলিশের ‘অনুপ্রবেশে’ পণ্ড বিএনপির অবস্থান কর্মসূচি

প্রেস ক্লাবের সামনে বিএনপির কর্মসূচি থেকে ডিবি পুলিশ এক ছাত্রদল নেতাকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় টানাহেঁচড়ার শিকার হন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি : কালের কণ্ঠ

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা থেকে এক ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচি চলছিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে। ওই কর্মসূচি শেষ হওয়ার ১৩ মিনিট আগে ১১টা ৪৭ মিনিটে শুরু হয় সাদা পোশাকের গোয়েন্দা পুলিশের অভিযান।

ওই কর্মসূচি থেকেই টানাহেঁচড়া ও চ্যাংদোলা করে ছাত্রদলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি মিজানুর রহমান রাজকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আঁকড়ে ধরেও গ্রেপ্তার এড়াতে পারেননি তিনি। বরং অন্যরা বাধা দিতে গেলে নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। এতে পণ্ড হয়ে যায় বিএনপির অবস্থান কর্মসূচি।

এ ঘটনায় আগামীকাল শনিবার ঢাকা মহানগরীর থানায় থানায় প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। এই প্রতিবাদ কর্মসূচি জানিয়ে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, একেবারেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে তাঁরা (পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা) অনুপ্রবেশ করে পরিকল্পিতভাবে বানচাল করে দিচ্ছেন।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, পুলিশ শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক কর্মসূচিকে ভেঙে দিচ্ছে, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করছে। তারা কর্মসূচির ভেতরে ঢুকে থাকে, পাশাপাশি থাকে, স্লোগান দেয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মিলিয়ে। তার পরে তারা (পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা) নেতাকর্মীদের অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করছে। বেছে বেছে নেতৃস্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি এসব ঘটনার নিন্দা জানান।

অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ১১টা ৪৭ মিনিটে কর্মসূচির পশ্চিম দিক থেকে গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা ছাত্রদলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি মিজানুর রহমান রাজকে ধরতে গেলে গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি প্রেস ক্লাবের গেটের দিকের ফুটপাতে বসে থাকা সিনিয়র নেতাদের কাছে চলে আসেন। মির্জা ফখরুলসহ উপস্থিত সিনিয়র নেতাদের আঁকড়ে ধরে গ্রেপ্তার এড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু সেখান থেকে অনেকটা জোর করে চ্যাংদোলা অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয় রাজকে। টানাহেঁচড়ার একপর্যায়ে তার গায়ের জামা ছিঁড়ে যায়। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে গাড়িতে তোলা হয়।

 

এর আগে রাজকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে গেলে তুমুল হট্টগোল শুরু হয়। অন্য নেতাকর্মীরা দাঁড়িয়ে যায়। শুরু হয় দৌড়াদৌড়ি। এরই মধ্যে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে পুলিশ। ধাক্কাধাক্কিতে রাস্তায় পড়ে যান কয়েকজন সিনিয়র নেতা।

ওই সময়ে দলটির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি মাইকে বলছিলেন, ‘পুলিশ ভাইয়েরা আপনারা এসব কী করছেন। আমাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে দিন।’

নেতাকর্মীদের দৌড়াদৌড়ির মধ্যে মাইক নিয়ে বিএনপির মহাসচিব ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘পুলিশ সম্পূর্ণ বিনা উসকানিতে আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। আমি ধিক্কার জানাচ্ছি, নিন্দা জানাচ্ছি। যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, দায়ী ব্যক্তিদের অবিলম্বে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’

পরে পুলিশ নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দিলে সভা পণ্ড হওয়ায় সিনিয়র নেতাসহ কর্মীরা ওই এলাকা ত্যাগ করে।

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে পূর্বঘোষিত এই কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগেভাগেই কর্মীরা প্রেস ক্লাবের সামনে চলে আসে। তবে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা ছিল। রাখা ছিল জলকামান, এপিসি কার ও প্রিজন ভ্যান।

প্রেস ক্লাবের সামনে ফুটপাত ও সংলগ্ন সড়কে ব্যানার হাতে নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেয়। কয়েক হাজার নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে অবস্থান কর্মসূচি সমাবেশে রূপ নেয়। পুলিশ এক পাশের সড়কের মাঝখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করে দেয়।

পণ্ড হওয়ার আগে কর্মসূচিতে বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জয়নুল আবদিন ফারুক, আবদুস সালাম, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, কামরুজ্জামান রতন, আবদুস সালাম আজাদ, শহীদুল ইসলাম বাবুল, কাজী আবুল বাশার, আফরোজা আব্বাস, আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, মোরতাজুল করীম বাদরু, মামুনুর রশীদ, ২০ দলীয় জোটের শরিক এলডিপির সাহাদাত হোসেন সেলিম, জাগপার খন্দকার লুত্ফর রহমান, সাম্যবাদী দলের সাঈদ আহমেদ প্রমুখ।

এ ছাড়া আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, আবদুল আউয়াল মিন্টু, মাহবুবুল হাসান পিংকু, ডা. সালাহ উদ্দিন মোল্লাসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

কর্মসূচিতে মওদুদ আহমদ বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করতে হবে। পাশাপাশি আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিতে হবে। ব্যালটের মাধ্যমে অপশাসনের পতন ঘটানো হবে।’ খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সব ‘গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল’কে শরিক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কর্মসূচি পণ্ড হওয়ার পর দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা যে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি করছি, এতে বোধ হয় সরকারের গাত্রদাহ হয়েছে। সে জন্য তারা (পুলিশ) উসকানি দিয়ে আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অনুপ্রবেশ করে পরিকল্পিতভাবে বানচাল করে দিচ্ছে।’

রাজকে গ্রেপ্তারের ঘটনা সম্পর্কে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘কিভাবে তাকে কাপড়চোপড় ছিঁড়ে ফেলে গলা টিপে ধরে গাড়িতে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। যেভাবে রাজকে তুলে নেওয়া হয়েছে, তা কোনো স্বাধীন দেশে পুলিশ নিয়ে যেতে পারে এটা আমরা ধারণা করতে পারি না।’ গত এক মাসে দলের নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, শামসুজ্জামান দুদু, আমানউল্লাহ আমানসহ সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে উল্লেখ করে অবিলম্বে তাদের মুক্তির দাবি জানান ফখরুল।

 

 


মন্তব্য