kalerkantho


কপোতাক্ষের ভাঙনে দীর্ঘ হচ্ছে গৃহহীনদের তালিকা

নিখিল ভদ্র ও কৌশিক দে, পাইকগাছা (খুলনা) থেকে ফিরে   

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



কপোতাক্ষের ভাঙনে দীর্ঘ হচ্ছে গৃহহীনদের তালিকা

‘রান্না করতিছিলাম। এর মধ্যি দুইখান ঘর নদীতি নিয়া গেল। এইভাবে আর কত দিন! কিন্তু কই যাব? নদীর ওই পারে জমি ছিল, এখন আবার চর হইছে। গরুর ঘাস কাটতি গেলেও তাড়াইয়া দেয়। কোথাও আমাগো কোনো ঠাঁই নাই। কানতি কানতি চোখের জলও শুকাইয়া গ্যাছে। আমাগো কষ্ট দেখার কেউ নাই।’

আবেগাপ্লুত হয়ে এভাবেই কথা বলছিলেন খুলনার কপোতাক্ষ নদের ভাঙনে সর্বস্বান্ত পাইকগাছা উপজেলার রামনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা গৃহবধূ কালিদাসী বিশ্বাস। শুধু তিনি নন, কপোতাক্ষের অব্যাহত ভাঙনে বাপ-দাদার ভিটা-মাটিসহ সব হারিয়ে নিঃস্ব উপজেলার কপিলমুনি ও হরিঢালী ইউনিয়নের পাঁচ শতাধিক পরিবার। ইতিমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদরাসা, মন্দির, কবরস্থানসহ হাজার হাজার ফলদ ও বনজ গাছ। পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ ভাঙনে।

সরেজমিন ভাঙনকবলিত এলাকা ঘুরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় দুই যুগ ধরে প্রতিনিয়ত ভাঙছে নদী, দীর্ঘ হচ্ছে গৃহহীনদের তালিকা। ইতিমধ্যে অনেকে বসতভিটা ছেড়ে হয়েছে উদ্বাস্তু। সব হারিয়ে ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নিয়েছে কেউ কেউ।

মালত মৌজার বাসিন্দা মো. নগর আলী মোড়ল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের কথা শুনে কোনো লাভ নাই। এসব দেখার কেউ নাই। অনেকেই অনেক আশ্বাস দিছে; আমাদের কিছু হয় নাই।’

রামনাথপুর গ্রামের বিদ্যুৎ বিশ্বাস জানান, ১৯৯৬ সালে আরসিসি ব্লক দেওয়া হয়। রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় তা এখন হারিয়ে গেছে। মৃতপ্রায় নদীতে নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় শুধু পরিবার নয়, গ্রামকে গ্রাম বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

কার্তিক বিশ্বাস, মনীষা, কালিদাসী, লিপিকা ও বিকাশ বিশ্বাসের কথা যেন অভিন্ন। ঘরভাঙা, ফসলি জমি আর সহায় সম্বল হারানো গল্পটা হয়তো অর্থের মাপকাঠিতে কম-বেশি হবে কিন্তু তাঁদের ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর বেদনার ভাষা এক। ইতিমধ্যে তাঁদের গ্রাম দরগাহমহল বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে তাঁরা জানান।

ওই গ্রামের বৃদ্ধা মেহেরুন্নেছার অভিযোগের সঙ্গে উঠে আসে বেঁচে থাকার আত্মবিশ্বাসে সাহসী পদক্ষেপের কথা, পাঁচবার বাড়ি ভাঙা মেহেরুন্নেছার স্বপ্ন অন্যদের সঙ্গে নিয়ে বাঁচার। এত দিন কাউকে যখন কাছে পাননি, এবার ভিক্ষা করে গাড়ি ভাড়া জোগাড় করে হাসিনার (প্রধানমন্ত্রী) কাছে যাবেন, বলেন মেহেরুন্নেছা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ সালাম উল্লাহ জানান, ২০০০ সাল থেকে ভাঙন শুরু হলেও তালা উপজেলার পাখিমারা বিলের টিআরএম (জোয়ার-ভাটা) প্রকল্প গ্রহণ করার পর এ অঞ্চলের ভাঙন বেড়েছে বহুগুণ। নদী আগের গতিপথে ফিরে গেলে এ পাড়ের ভাঙন রক্ষা করা সম্ভব হবে।

ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পাইকগাছা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. রশিদুজ্জামান বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়ে অনেককে নদীর ওপারে জেগে ওঠা চরে পুনর্বাসন করেছি। কিন্তু এখন সেই উদ্যোগ নেই। ভাঙন প্রতিরোধের পাশাপাশি গৃহহারা মানুষকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে।’

স্থানীয়দের দাবি, নদীশাসন, জলবায়ুর পরিবর্তন ও নদীর মূল স্রোতধারা পরিবর্তন হওয়ার কারণে ভাঙন বৃদ্ধি পেয়েছে। খননের মাধ্যমে কপোতাক্ষকে তার মূল ঠিকানায় ফেরাতে পারলে ভাঙন কমে আসবে। এ জন্য টিআরএম প্রকল্প চালু করতে হবে।

উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার কপোতাক্ষ খননে ২৬২ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে। গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে বিভিন্ন দপ্তরে দেনদরবার করছে এলাকাবাসী। তাদের দাবি, চলমান সমস্যা সমাধানে যেন মূল ম্যাপ অনুযায়ী কপোতাক্ষ খনন করা হয়। তাহলে নদী মূল গতিপথ ফিরে পাবে। অন্যদিকে গৃহহীন পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁইও হবে।

এ বিষয়ে কপিলমুনি ইউপি চেয়ারম্যান কওসার আলী জোয়ার্দার কালের কণ্ঠকে বলেন, ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

খুলনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হারুন-অর রশীদ বলেন, ‘ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে ওই এলাকা পরিদর্শন করেছি। স্থানীয়দের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনাও হয়েছে।’

এ বিষয়ে প্রকল্প বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী পীযুষ কৃষ্ণ কুণ্ডু। তিনি বলেন, বরাদ্দ পাওয়াসাপেক্ষে ভাঙন রোধে কাজ শুরু করা হবে।


মন্তব্য