kalerkantho


আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ

ডালিয়া আপা

হাকিম বাবুল, শেরপুর   

৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ডালিয়া আপা

দুস্থ রোগীর জন্য রক্তের প্রয়োজন; কোথায় যাওয়া যায়? রোগীকে বিশেষ চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে; সাহায্য করবেন কে? কোনো নারী নির্যাতিত হয়েছেন; প্রতিবাদ করছেন কে? শিক্ষার্থী টাকার অভাবে লেখাপড়া করতে পারছে না, তার দায়িত্ব নেবেন কে?—এ রকম শত প্রশ্নের উত্তরে একটি নামই সবার আগে মনে পড়ে ‘রাজিয়া সামাদ ডালিয়া’। শেরপুরে ছোট-বড় সবার তিনি ‘ডালিয়া আপা’। অসহায়ের সহায় ডালিয়া আপা (৭৫) মানবতার সেবায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

দুস্থ-অসহায় রোগীর সেবার জন্য ডালিয়া গড়েছেন শেরপুরে ডায়াবেটিক হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। হাত দিয়েছেন হার্ট ফাউন্ডেশনের কাজে। খেলাঘর থেকে শুরু করে রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, মাদক নিয়ন্ত্রণ, পরিবশে সংরক্ষণ, নারী উন্নয়ন, সামাজিক আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই তিনি পথপ্রদর্শন করছেন। অনেকেরই আদর্শ ও অনুপ্রেরণা তিনি। তাঁর কর্মকাণ্ড নারীসমাজ ও তরুণদের সামনে এগিয়ে নিতে সাহায্য করছে বলে জানান সুধীজন ও জনপ্রতিনিধিরা। সুযোগ পেলেই তিনি নিজের গড়া ডায়াবেটিক হাসপাতালে রোগীদের সেবা করে সময় কাটান। শহরের দুর্গানারায়ণপুরে নিজ বাড়ি ‘আনন্দধাম’ চত্বরে গড়েছেন দুর্লভ প্রজাতির ফুলের বাগান। বইপড়া, বাগানের পরিচর্যা আর নতুন কিছু করার চিন্তায় অবসর সময় কাটান। এখনো তিনি কোদল চালিয়ে বাগানের জমি তৈরির কাজ করেন।

১৯৯৭ সালে ডালিয়া ডায়াবেটিক হাসপাতালের কাজ শুরু করেছিলেন শেরপুর শহরের খরমপুর নতুন বাজার এলাকায় নিজের বাড়িতে। এখন হাসপাতালের পাঁচতলা ভবন হচ্ছে। হাসপাতালে দরিদ্র রোগীদের সহায়তার জন্য ডালিয়া সুদমুক্ত ঋণ ও আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা চালু করেছেন। ইনসুলিন কিনতে দরিদ্র রোগীদের সহায়তা দেওয়া হয়। দরিদ্র রোগীদের তিনি বিভিন্ন চিকিৎসক এবং হাসপাতালে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। শেরপুর জেলা হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার জন্য তিনি একজন আয়া রেখে দিয়েছেন, যাঁর বেতনও তিনি দেন। তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির শেরপুরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

শেরপুরের নারীদের একত্রিত করে ‘উজ্জয়িনী’ সংগঠন গড়েন ডালিয়া। ‘উজ্জয়িনী’র মাধ্যমে চার বছর ধরে শীতের পিঠা উৎসব হয়ে আসছে শেরপুরে। এটি শেরপুরবাসীর মধ্যে নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছে। ডালিয়া ‘উজ্জয়িনী’র সভাপতি। খান বাহাদুর ফজলুর রহমান ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় ও উজ্জয়িনীর ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছর শেরপুরে বিনা মূল্যে চক্ষু অপারেশনের আয়োজন হয়। ডালিয়া তাঁর বাড়িতে রেখে কয়েকজন এতিম ছেলে-মেয়েকে লেখাপড়াও করাচ্ছেন। অসহায় পরিবারকে থাকার জন্য ঘরের ব্যবস্থা করে দেন। ১৯৯০ সালে কুড়িয়ে পাওয়া দুই মেয়েশিশুকে নিজের কাছে রেখে লেখাপড়া শেখান। এখন তাঁরা চাকরিজীবী। দুই সন্তানের জননী ডালিয়া তাঁদেরও নিজের সন্তান বলে পরিচয় দেন। দুই দশক আগে শ্রীবরদী বালিজুড়ি পাহাড়ে গারো মেয়ে ফাইমনি মারাকের কুষ্ঠ হলে পরিবারের সদস্যরা ‘মরণরোগ’ বলে তাকে একটি টং বানিয়ে পাহাড়ের ঢালে হিংস্র বন্য প্রাণীর খাবারের জন্য  রেখে আসে। ডালিয়া মেয়েটিকে নিজের বাড়িতে দুই বছর রেখে চিকিৎসা করিয়ে ভালো করে পরিবারের কাছে ফেরত দেন। বর্তমানে ১৫ জন হতদরিদ্র ছেলে-মেয়ে ডালিয়ার আর্থিক সহায়তায় লেখাপড়া করছে। এর কয়েকজন ডাক্তারি, প্রকৌশলবিদ্যা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন।

ডালিয়ার জন্ম শেরপুর শহরের খরমপুরে ১৯৪৩ সালের ১ ডিসেম্বর খান বাহাদুর ফজলুর রহমান ও লুৎফুন্নেছার ঘরে। বাবা ছিলেন তৎকালীন অভিভক্ত বাংলার চিফ হুইপ। চট্টগ্রাম মহিলা কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রিধারী ডালিয়ার বিয়ে হয় ১৯৬৪ সালে প্রকৌশলী আব্দুস সামাদের সঙ্গে। ১৯৮৩ ডালিয়া ঢাকার স্কুলে শিক্ষকতায় ঢোকেন। ১৯৯০ সালে চাকরি ছেড়ে চলে আসেন শেরপুরে। নিজের জমানো অর্থ-পারিবারিক সম্পদ বেচে তিনি মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেন। বাবার নিজ গ্রাম সদর উপজেলার ফটিয়ামারীতে ‘উপমা’ বিদ্যালয় ও দরিদ্রদের সুলভে চিকিৎসাসেবা দিতে শহরের সজবরখিলা এলাকায় ‘উপমা হাসপাতাল’ চালু করেন। দরিদ্র নারীদের নিজের বাসায় রেখে নকশি কাঁথা সেলাই শেখানোর ব্যবস্থা করেন।

ডালিয়া বলেন, ‘মানুষের কল্যাণে কাজ করতে গিয়ে ঢাকার জমি, রাজশাহীতে শ্বশুরবাড়ির জমি, শেরপুরে  পৈতৃক ওয়ারিশের সম্পত্তি সবই গেছে। কিন্তু তাতে আফসোস নেই। আমি সমাজটাকে বদলাতে চেয়েছি। এখন আমার কাজে ভাই-বোন, ভাগ্নে-ভাগ্নি, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষীরা সহায়তা করে। কাজ করতে গেলে টাকা সমস্যা না, সমস্যা মানসিকতার। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কত লোকের পাশে দাঁড়াতে পারি, এটাই আমার চিন্তা।’



মন্তব্য