kalerkantho


ভালুকায় শিক্ষকের পিটুনিতে মৃত্যু মাদরাসা শিক্ষার্থীর

মাদরাসা সুপার আটক

ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি   

৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



কোরআন শিক্ষার জন্য শিশু তাওহিদুল ইসলাম মীরকে দেওয়া হয়েছিল মাদরাসায়। এরই মধ্যে ১৪ পারা আয়ত্তে নিয়েছিল সে; কিন্তু রবিবার রাতে মৃত্যু হয়েছে ১১ বছর বয়সী এ শিশুর। এ ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে পড়া মুখস্থ বলতে না পারায় মাদরাসা শিক্ষকের বেদম পিটুনির শিকার হয়েছিল তাওহিদুল। তাঁর কারণেই শিশুটির অকাল মৃত্যু। পুলিশ অভিযুক্ত মাওলানা আমিনুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে মাদরাসাটির সুপার মাওলানা এনামুল হককে। ঘটনাটি ময়মনসিংহ ভালুকার মাদরাসায়ে উমর (রা.) হাফেজিয়া অ্যান্ড ইসলামী কিন্ডারগার্টেনের।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ভালুকা উপজেলার ডাকাতিয়া ইউনিয়নের পাঁচগাঁও গ্রামের হোসেন আলী মীর কায়েসের ছেলে তাওহিদুল ইসলাম। কোরআনে হাফেজ বানানোর জন্য তাকে পাঁচ বছর আগে আবাসিক ছাত্র হিসেবে ভর্তি করা হয় হবিরবাড়ী ইউনিয়নের জামিরদিয়া গ্রামে মাদরাসায়ে উমর (রা.) হাফেজিয়া অ্যান্ড ইসলামী কিন্ডারগার্টেনে। এরই মধ্যে ১৪ পারা কোরআন মুখস্থ করায় শিশুকে নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছিল পরিবারটি। গত ২২ ফেব্রুয়ারি শিক্ষক আমিনুল ইসলাম দেড় পারা কোরআন মুখস্থ করতে দেন। আর তা পরদিন ধরলে মুখস্থ বলতে পারেনি তাওহিদুল। এ জন্য শিশুটিকে বেধড়ক মারপিট করেন মাওলানা আমিনুল। অসুস্থ হয়ে পড়লে শিশুকে মাদরাসায় রেখে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

চার দিন পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে মাদরাসা থেকে ফোন করে মীর কায়েসকে বলা হয়, ‘ফুটবল খেলতে গিয়ে আপনার ছেলে আহত হয়েছে। তাকে ভালুকা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আপনি আসেন।’

হাসপাতালে গিয়ে দেখার পর গত মঙ্গলবার মীর কায়েস ছেলেকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। এর দুই দিন পর শরীরে প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে তাওহিদ প্রলাপ বকতে থাকে। এ সময় সে বলে, ‘হুজুর গো হুজুর, আমারে আর মারুই না যেন। রাকিব ভাই গো আমারে বাঁচাও, হুজুর আমারে মাইরা ফালাইলো।’ এসব শুনে সন্দেহ দানা বাঁধে। মাদরাসাটিতে আর ফেরত পাঠানো হবে না বলে আশ্বাস দিলে তাওহিদ বাবার কাছে সব ঘটনা খুলে বলে। হুজুর দুই পা ফাঁক করে হাঁটুর নিচে বেধড়ক পিটিয়েছে বলে জানায়। তখন শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বিবেচনায় তাওহিদকে দ্রুত নেওয়া হয় ময়মনসিংহের চুরখাই কমিউনিটি বেজড হাসপাতালে। সেখানে দুই দিন চিকিৎসার পর তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। গত রবিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে শিশুটির মৃত্যু হয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালে স্থানান্তরের সময়।

মা হেনা আক্তার বলেন, ‘হাফেজ বানানোর জন্য আমার বাবারে ওই মাদরাসাত দিছিলাম। আমার ফুলের মতো বাবাডারে হুজুর বাইরাইয়া মাইরা ফালাইছে।’ বাবা মীর কায়েস ছেলে হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।

মাদরাসার শিক্ষার্থীরা জানায়, আমিনুল হুজুর তাদের সামনেই তাওহিদকে অনেক পিটিয়েছেন। কাকুতি-মিনতি করলেও হুজুর তার কথা শোনেননি। আসল ঘটনা প্রকাশ না করার জন্য শিক্ষার্থীদের বলা হয়েছিল।

এদিকে গতকাল অভিযোগ পেয়ে পুলিশ তাত্ক্ষণিক অভিযান চালিয়ে মাদরাসা সুপার মাওলানা এনামুল হককে আটক করেছে। পলাতক সহকারী শিক্ষক আমিনুল ইসলামের বাড়ি ঈশ্বরগঞ্জের নিকলী গ্রামে। তাঁর বাবার নাম চান মিয়া। তাওহিদের মৃত্যু সংবাদ শুনেই তিনি পালিয়ে যান। সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ভালুকা মডেল থানার ওসি মামুন-অর-রশিদ জানান, মাদরাসা থেকে ছাত্রদের পেটানোর কাজে ব্যবহার করা একটি লাঠি উদ্ধার করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে একজনকে। মূল আসামি গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুতকারী এসআই নজরুল ইসলাম জানান, নিহত শিশুর শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

আটক মাদরাসা সুপার মাওলানা এনামুল হক পুলিশের কাছে দাবি করেছেন, ঘটনার দিন তিনি মাদরাসায় ছিলেন না। ছাত্রকে পেটানোর বিষয়টি তাঁর কাছে গোপন করা হয়েছে।

 

 



মন্তব্য