kalerkantho


বিকল্পের অভাবেই রাজত্ব চলছে পলিথিনের

শওকত আলী   

৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



রাজধানীর ফকিরাপুলের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম। বাসার আশপাশের দোকান থেকেই তিনি নিত্যদিনের কেনাকাটা করেন। গত রবিবার তিনি চার রকমের সবজি, দুই রকমের মাছ, চাল ও মসলা কেনেন। এই কেনাকাটায় বিক্রেতারা সবজির জন্য তিনটি, দুই প্রকারের মাছের দুটি, চালের জন্য একটি এবং মসলার জন্য একটিসহ মোট সাতটি পলিথিন তাঁকে বিনা মূল্যে দিয়েছে। আমিনুলের মতো যারা অন্তত রাজধানীতে বাজার করে তারা প্রত্যেকে প্রতিদিন চার-পাঁচটি পলিথিন নিয়ে বাসায় ফেরে। ফ্রিজে মাছ বা মাংস সংরক্ষণ করা ছাড়া বাড়তি পলিথিনগুলোর জায়গা হয় ময়লার ঝুড়িতে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) ২০১৭ সালের তথ্য থেকে জানা যায়, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যবহার করা হয়; যার বেশির ভাগই শুধু একবারের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর এগুলোর জায়গা হয় ময়লার স্তূপ বা ড্রেনের মধ্যে। ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা তৈরিতে দীর্ঘদিন ধরেই এসব ভূমিকা রাখছে। এসব জমি এবং স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

একসময় বেশ কিছুদিন পলিথিন নিয়ে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর নানা আলোচনা, সমালোচনা ও কর্মতৎপরতা দেখা গেছে। এর ব্যবহারও অনেকটা কমে গিয়েছিল। অনেক দোকানি কাগজের ঠোঙা ব্যবহার করেছে। কিন্তু এখন আবার পুরনো চিত্রই ফিরে এসেছে। যত্রতত্র এর ব্যবহার নিয়মিত হয়ে পড়েছে; যদিও ২০০২ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে পরিবেশ দূষণকারী সব ধরনের পলিথিনের উৎপাদন, মজুদ, পরিবহন, বিপণন, ব্যবহার, বাণিজ্যিক ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পলিথিন থেকে বের হয়ে আসার জন্য তিনটি কাজ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত সচেতনতা, দ্বিতীয়ত সস্তায় বিকল্প ব্যবস্থা এবং তৃতীয়ত আইনের কঠোর প্রয়োগ। ২০১০ সালে পলিথিনের বদলে পাটজাত ব্যাগ ব্যবহারের আইন পাস করা হলেও এর কার্যকর প্রভাব বাজারে নেই। ব্যাগে বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যবহারকে জনপ্রিয় করতে পারেনি সরকার।

এ বিষয়ে জেটিপিডিসির (বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি শাখা) পরিচালক ড. মো. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা গবেষণা করে একটি পাটের ব্যাগ উদ্ভাবন করেছি; যার দাম ১০-১২ টাকা। তবে বাণিজ্যিক উৎপাদনে দাম আরো কমানো সম্ভব। এটি অন্তত ছয় মাস ব্যবহার করা সম্ভব। তবে এখনো এর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়নি।’

এ ছাড়া বিজেএমসি একটি প্রকল্প নিয়েছে পলিথিনের ব্যাগের বিকল্প একটি ব্যাগ করার। এটি দেখতে হুবহু পলিথিনের মতোই হবে; কিন্তু পাটের তৈরি। এ ব্যাগের খরচ হবে তিন-চার টাকার মতো। এটি বাজারে এলে বড় একটি পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন পাটজাত পণ্যের বহুমুখীকরণে কাজ করা এই গবেষক।

রাজধানীর বেশ কিছু ক্রেতা-বিক্রেতা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইন বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা, যথেষ্ট সচেতনতা তৈরির অভাব এবং বিকল্প কোনো ব্যবস্থা জনপ্রিয় না হওয়ার কারণেই  জমজমাট পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার চলছে। যদিও পলিথিনের উৎপাদন ও দোকানিদের কাছে বিক্রির কাজটি চলে বেশ গোপনীয়তা বজায় রেখে।

কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, ধানমণ্ডি, হাতিরপুল, ফকিরাপুলসহ কয়েকটি স্থানে দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাতে দোকানগুলো বন্ধের আগে এবং ভোরবেলায় সাপ্লায়াররা পলিথিন পৌঁছে দেয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ‘অনেক ট্রাফিক পুলিশ রয়েছেন যাঁরা ট্রাকে পলিথিন বহন করতে দেখলে আমাদের খবর দেন, তাঁদের আটকানোর ব্যবস্থা করেন। আবার অনেকে রয়েছেন যাঁরা টাকা নিয়ে এগুলো ছেড়ে দেন।’

কেরানীগঞ্জ, লালবাগ, পুরান ঢাকা, জিনজিরা, তেজগাঁও, টঙ্গী, সাভারসহ অনেক জায়গায় পলিথিনের কারখানা চলছে। কিছু জায়গায় অভিযান করতে গেলে পরিবেশ অধিদপ্তরকেই চাপের মধ্যে পড়তে হয়। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার কারণেও অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। টুকটাক অভিযান হলে সেটা শুধু গুদামের ওপর দিয়েই যায়। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ অভিযান পরিচালনা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। সে সময় মিরপুরের বিভিন্ন জায়গার ১০টি দোকান থেকে ১৩০ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন উদ্ধার ও ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়।


মন্তব্য