kalerkantho


মিরসরাই থেকে বাজারজাত হয় ৪০০ কোটি টাকার মাছ

এনায়েত হোসেন মিঠু, মিরসাই (চট্টগ্রাম)   

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মিরসরাই থেকে বাজারজাত হয় ৪০০ কোটি টাকার মাছ

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে মুহুরী প্রজেক্ট এলাকার একটি প্রকল্পে উৎপাদিত দেশি প্রজাতির মাছ। ছবি : কালের কণ্ঠ

চট্টগ্রামের মোট মৎস্য চাহিদার বেশির ভাগ উৎপাদন হয় মিরসরাইয়ে। ১৯৮৬ সালের পর থেকে এখানে বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ শুরু হয়। বর্তমানে কয়েক হাজার একর জলাশয়ে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করছে অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। একসময়ের অনাবাদি জমিতে ঘের তৈরি করে মাছ চাষের মাধ্যমে তারা অবদান রাখছে দেশের অর্থনীতিতে।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলার মোট মৎস্য চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ উৎপাদন হয় মিরসরাই উপজেলার বিভিন্ন মাছের ঘের থেকে। এখানে উৎপাদিত মাছ চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা, পার্বত্য এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত করা হয়। এ অঞ্চলের মানুষের শতভাগ মাছের চাহিদা পূরণ হয় ওচমানপুর, ধুম ও ইছাখালী ইউনিয়নের চাষাবাদ থেকে। বছরে যার পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার ৫৫০ মেট্রিক টন। আর এ খাত থেকে আয়ের পরিমাণ বছরে ৪০০ কোটি টাকার বেশি।

জানা গেছে, ১৯৮৪ সালে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় এবং ফেনী নদীর শেষ প্রান্তে বৃহৎ মুহুরী সেচ প্রকল্প স্থাপন করে সরকার। এটি স্থাপনের পর মিরসরাই উপকূলের দরিদ্র মানুষের ভাগ্য বদল শুরু হয়। ১৯৮৬ সাল থেকে মৎস্য চাষ করে এখানকার বেকার যুবকদের ভাগ্যের নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। একসময় এখানে লবণাক্ত পানির কারণে জমিতে এক মৌসুমে ফসল ফলানো কষ্টসাধ্য ছিল। আজ মাছ চাষের কারণে সেসব জমিতে সোনা ফলছে। ইতিমধ্যে দেশের বৃহৎ মৎস্য জোন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে উপজেলার ওচমানপুর, ধুম ও ইছাখালী এলাকার চরাঞ্চল।

স্থানীয় মৎস্য চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথমে সরকারি জমি লিজ নিয়ে শৌখিন মৎস্য চাষিরা এখানে মৎস্য চাষ শুরু করে। এরপর তাদের দেখাদেখি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা শত শত মৎস্য প্রকল্প গড়ে তোলে। তারা জানায়, ১৯৮৬ সালে স্থানীয় ওচমানপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাঈনুল ইসলাম ৯ একর জমিতে রিংকু ফিশ নামের মৎস্য প্রকল্প গড়ে তোলেন। এরই ধারাবাহিকতায় আবুল খায়ের কম্পানি, বাবুল সওদাগর, এম এইচ লাভলু চৌধুরীও আধুনিক পদ্ধতিতে মৎস্য প্রকল্প গড়ে তোলেন। তাঁদের সফলতার পথ ধরে ধীরে ধীরে এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবকরা চাকরির পিছে না ছুটে বেকারত্বের অভিশাপ ঘোচাতে গড়ে তোলে মৎস্য প্রকল্প। এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশের অনেক নামিদামি প্রতিষ্ঠান এখানে বাণিজ্যিকভাবে মৎস্য প্রকল্প গড়ে তুলেছে। মেরিডিয়ান গ্রুপ, ক্লিফটন গ্রুপ, আবুল খায়ের কম্পানি, ফিরোজা হক এগ্রো ফিশ লিমিটেড, আলাউদ্দিন এগ্রো ফিশ প্রকল্প, মামুন গ্রুপ, সততা ফিশ প্রকল্প, রিংকু ফিশ প্রকল্পসহ দুই হাজারের বেশি মৎস্য প্রকল্প রয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১৫ হাজার শ্রমজীবী মানুষ এসব প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত। এক হাজার ৩৮৩ একর এলাকায় রয়েছে ১২৭টি চিংড়ি প্রকল্পও।

ফিরোজা হক এগ্রো ফিশ লিমিটেডের পরিচালক সাইফুল ইসলাম কম্পানি বলেন, এখানে ফেনী নদীতে বাঁধ দেওয়ার পর প্রায় ৫০ হাজার একর জমি জেগে উঠেছে। অনেক জমি এখনো খালি রয়েছে। সরকারের উচিত, মাস্টারপ্ল্যান করে পরিকল্পিতভাবে এখানে মৎস্য জোন গড়ে তোলা। এখানকার চাষিদের পৃষ্ঠপোষকতা, ব্যাংক ঋণ, প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে আধুনিক পদ্ধতিতে প্রায় তিনগুণ বেশি মৎস্য উৎপাদন সম্ভব। তিনি এ এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি ও ব্যাংকের শাখা স্থাপনেরও দাবি জানান।

স্থানীয় ৫ নম্বর ওসমানপুর ইউপি চেয়ারম্যান ও মৎস্য প্রকল্পের মালিক মফিজুল হক জানান, মুহুরী প্রকল্প এলাকায় মৎস্য চাষের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানের লোকজন নিয়োজিত। ৩১ বছরেও সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যায়নি। সরকারি উদ্যোগে পুরো প্রকল্প এলাকাকে মৎস্য জোনে পরিণত করে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিলে দেশের মাছের চাহিদায় মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে মুহুরী প্রকল্প। জানা গেছে, ১৯৮৬ সালের দিকে প্রতি একর জমিতে বছরে এক থেকে দেড় টন মাছ উৎপাদন সম্ভব হতো। কিন্তু আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করে বর্তমানে প্রতি একরে পাঁচ টনের বেশি মাছ উৎপাদন হয়। প্রতি একরে ১২ টন পর্যন্ত মাছ উৎপাদন সম্ভব বলে চাষিরা জানায়।

মৎস্য সমবায় সমিতির নেতা লাভলু চৌধুরী জানান, প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকারি সুযোগ-সুবিধার অভাবে পর্যাপ্ত মাছ চাষ হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। তা ছাড়া প্রয়োজন হিমাগার ও বরফকল স্থাপন।



মন্তব্য