kalerkantho


কিশোরগঞ্জ
ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে ৪৪ হাজার মামলা

বিচারক নেই তিন মাস

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বয়স ৭৫ পেরিয়ে গেছে সফর আলীর। তিনি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার সুতারপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। একটু আরাম-আয়েশ করে বাকি জীবনটা কাটাবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু যে ঝামেলায় পড়েছেন, তা এ জীবনে শেষ হবে কি না ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছেন না। ভুলে ভরা ভূমি জরিপের শিকার হয়ে ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালের বারান্দায় ঘুরে ঘুরে টাকা-পয়সা ও সময় দুটিই নষ্ট হচ্ছে তাঁর। ২০১৩ সালে কিশোরগঞ্জ ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে একটি রেকর্ড সংশোধনের মামলা করেছিলেন তিনি। মামলাজট ও বিচারক সংকটের কারণে বছরের পর বছর ঘুরেও রায় না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন তিনি। আদালতের বারান্দায় গত মঙ্গলবার তাঁর সঙ্গে কথা হলে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘খালি আই আর যাই, ট্যাহার উফরে তুফান। পাঁচ বছর দইর‌্যা গুরতাছি; কিন্তু কোর্টো আইয়্যা হাকিম ফাই না। বিচার ফাইয়াম কিবায়। মামলা চলুক বা না চলুক, এনো আইলেই উহিল, ফেশকার সবাই ট্যাহা ছায়। আর নতুন তারিখ দিয়ে আমরারে বিদায় দেয়।’

দুপুর দেড়টার দিকে দেখা গেল সফর আলীর চেয়ে আরো বয়স্ক এক ব্যক্তি একবার বেঞ্চ সহকারীর (পেশকার) কক্ষে আবার সেরেস্তাদারের কক্ষে ছোটাছুটি করছেন। কিন্তু এত ভিড়ের মধ্যে তিনি সুবিধা করতে পারছেন না। কারো সহযোগিতা পাচ্ছিলেন না তিনি। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তিনি জেলার কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা থেকে এসেছেন। ক্লান্ত-বিধ্বস্ত ইসমাইল মিয়া কোর্টের বারান্দায় বসে পড়েন। তাঁকে ব্যস্ততার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আমার একটা জমির নামের ঝামেলা আছে। হেইডা ঠিক করণের লাইগ্যা মামলাডা করছিলাম। এহন তো এই মামলার কুনু ল্যাংগুরই ফাইতাছি না। ফাঁছ বছর অইয়া গ্যাছে নোটিশই গেল না। খালি ট্যাহা দিতাছি আরা হেরা খাইতাছে। কুনু কাম অইতেছা না। এনো আইলেই তারিখ ফালাইয়া দ্যায়।’ শুধু সফর আলী বা ইসমাইল মিয়া নন, প্রতিদিন তাঁদের মতো শত শত ভুক্তভোগী ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালের বারান্দায় রেকর্ড সংশোধনের মামলা নিয়ে ঘোরাঘুরি করে। কিন্তু ট্রাইব্যুনালে তাদের মামলার কোনো অগ্রগতি হয় না। এর মধ্যে তিন মাস ধরে ট্রাইব্যুনালে কোনো বিচারক না থাকায় অবস্থা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

ট্রাইব্যুনালের সেরেস্তাদার সোহরাব আলী জানান, গত ২৭ নভেম্বর এই ট্রাইব্যুনালের বিচারক বদলি হয়ে চলে গেছেন। তিন মাস ধরে ট্রাইব্যুনালে কোনো মামলার শুনানি হচ্ছে না। ৪৩ হাজার ৬৯৫টি মামলা রয়েছে ট্রাইব্যুনালে। একজন আইনজীবী জানান, ট্রাইব্যুনালে যে পরিমাণ মামলা বিচারাধীন, এগুলো আগামী ৫০ বছরেও শেষ হবে না। তিনি জানান, বাংলাদেশে যে কয়টি ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল রয়েছে তার মধ্যে কিশোরগঞ্জে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে। অথচ এখানেই তিন মাস ধরে কোনো বিচারক নেই, যা খুবই দুঃখজনক।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৮৪ সাল থেকে বাংলাদেশ সার্ভে রিভাইজড (বিএসআর) নামে দেশে যে ভূমির জরিপ হয়, তা ভুলে ভরা একটি জরিপ। এগুলো দ্রুত সংশোধনের জন্য গঠন করা হয় ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনাল বা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু জরিপে ভুলের পরিমাণ এত বেশি যে যাদের জমিজমা রয়েছে, তাদের প্রায় সবাইকে প্রতিকার চেয়ে মামলা করতে হয়েছে ট্রাইব্যুনালে।

জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জালাল মো. গাউস বলেন, ‘ট্রাইব্যুনাল গঠনের শুরুর দিকে দেড় বছর কোনো বিচারক ছিল না। সেই থেকে মামলা জমতে জমতে আজ পাহাড় সমান হয়েছে। এখন আবারও তিন মাস ধরে বিচারক নেই। এ অবস্থায় ট্রাইব্যুনালের মূল লক্ষ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’ কিশোরগঞ্জের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিয়া মো. ফেরদৌস বলেন, ‘ভুলে ভরা জরিপ সংশোধনের সব ভার ট্রাইব্যুনালের ওপর ছেড়ে না দিয়ে উপজেলার ভূমি সহকারী কমিশনারকে (এসি ল্যান্ড) দেওয়া যেতে পারে। এ কাজ করতে হলে প্রয়োজনে আইন সংশোধন করবে সরকার। একই সঙ্গে কোর্টের সংখ্যাও বাড়াতে হবে। রেকর্ড সংশোধনের মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া দরকার।’

জেলা জজকোর্টের সরকারি আইনজীবী (জিপি) বিজয় শংকর রায় বলেন, ‘ভুলে ভরা জরিপের খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে যাদের জমিজমা রয়েছে প্রায় সবাইকে জরিপ সংশোধন করতে ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে হয়েছে। কিন্তু বিচারক না থাকায় মামলাগুলো এগোচ্ছে না, রায়ও আসছে না। ফলে মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে।’


মন্তব্য