kalerkantho


আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি

বিপিসি ফের লোকসানে

শিমুল নজরুল, চট্টগ্রাম   

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



টানা কয়েক বছর লাভের পর আবারও ফার্নেস অয়েল, ডিজেল ও কেরোসিনে লোকসান দিচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বর্তমানে প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েল বিক্রির ক্ষেত্রে লিটারপ্রতি প্রায় ১০ টাকা, ডিজেলে পাঁচ টাকা ও কেরোসিনে সাড়ে চার টাকা লোকসান গুনছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটি। আন্তর্জাতিক বাজারে এ তিনটি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে বিপিসি।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎকন্দ্র আবারও বিপিসির থেকে ফার্নেস অয়েল কেনা শুরু করেছে। এতে ফার্নেস অয়েলের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপিসির লোকসানও বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। বেসরকারি বিদ্যুৎকন্দ্রগুলোর অনেককেই সরকার ফার্নেস অয়েল আমদানির অনুমতি দেওয়ায় গত কয়েক বছর সরকারি পর্যায়ে আমদানি কমে গিয়েছিল।

এ প্রসঙ্গে বিপিসির পরিচালক (অপারেশন ও পরিকল্পনা) ও জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণী কমিটির আহ্বায়ক সৈয়দ মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বিপিসি এখন আমদানীকৃত জ্বালানি পণ্যে লোকসান দিচ্ছে। বিশেষ করে ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও কেরোসিন বিক্রির ক্ষেত্রে লোকসান দিতে হচ্ছে।’

জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আপাতত নেই। কারণ জ্বালানি তেলের মূল্য সরকার নির্ধারণ করে থাকে। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আমরা এখনো কোনো ধরনের নির্দেশনা পাইনি।’

জ্বালানি তেলের বিশ্বব্যাপী বাজার মূল্য নির্ধারণকারী সংস্থা প্লেটসের ১২ জানুয়ারির পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বর্তমানে ফার্নেস অয়েলের আন্তর্জাতিক মূল্য প্রতি মেট্রিক টন ৩৮১ দশমিক ১২ মার্কিন ডলার। আর প্রতি ব্যারেল ডিজেলের আমদানি মূল্য ৭৯ দশমিক ৩৪ ডলার এবং কেরোসিনের দাম ৭৯ দশমিক ৬৫ ডলার।

গত বছর জানুয়ারিতে ডিজেলের আন্তর্জাতিক মূল্য ছিল প্রতি ব্যারেল ৬৩ দশমিক ৫০ ডলার এবং কেরোসিনের মূল্য ছিল ৬৩ দশমিক ৪৪ ডলার। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে চলতি জানুয়ারি মাস পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে ফার্নেস অয়েলের দাম বেড়েছে ২০৪ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এখন প্রতি লিটারে আমদানি মূল্য বেড়েছে প্রায় ১৫ টাকা ৭১ পয়সা।

জ্বালানি তেল আমদানির সঙ্গে সম্পৃক্ত বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, গত তিন মাস ধরে ফার্নেস অয়েলের আন্তর্জাতিক মূল্য ঊর্ধ্বমুখী। আর ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ছে গত এক মাস ধরে। আগামী দিনে ফার্নেস অয়েলের দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমানে এই দরে ফার্নেস অয়েল আমদানি করায় প্রতি লিটারের দাম পড়ে (ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ) ৫২ টাকা, ডিজেলের দাম পড়ে ৭০ টাকা এবং কেরোসিনের দাম পড়ে ৬৯ টাকা ৫০ পয়সা। এর সঙ্গে বিপণন কম্পানির সার্ভিস চার্জ, পরিবহন খরচ ও পরিবহন লস যোগ করলে মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ফার্নেস অয়েলের প্রতি লিটারে ৯ থেকে ১০ টাকা, ডিজেলে পাঁচ টাকা, কেরোসিনে সাড়ে চার টাকা। বর্তমানে বিপিসি ফার্নেস অয়েল বিক্রি করে ৪২ টাকায়, ডিজেল ও কেরোসিন ৬৫ টাকা লিটার দরে।

বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, বেসরকারি বিদ্যুৎকন্দ্রের মালিকপক্ষের চাপে ২০১৬ সালে ৩০ মার্চে গেজেটের মাধ্যমে ফার্নেস অয়েলের দাম কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। এর আগে ৬০ টাকা লিটার দরে ফার্নেস অয়েল বিক্রি করত বিপিসি। গেজেট প্রকাশের পর ১ এপ্রিল থেকে বিপিসি এক লাফে ১৮ টাকা কমিয়ে দেয় ফার্নেস অয়েলের দাম। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে ফার্নেস অয়েলের দাম ছিল প্রতি মেট্রিক টন ১৭৬ ডলার। ওই সময় বিপিসি ফার্নেস অয়েল বিক্রির ক্ষেত্রে খুব সামান্য লাভ করেছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য আবুল বাসার খান স্বাক্ষরিত এক পত্রে জানানো হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন এবং অন্যান্য বেসরকারি বিদ্যুৎকন্দ্রগুলোতে আট লাখ ৫২ হাজার ১২৬ মেট্রিক টন ফার্নেস অয়েল প্রয়োজন হবে। ফার্নেস অয়েলের মাধ্যমে পরিচালিত বিদ্যুৎকন্দ্রের নাম ও তাদের এক বছরের চাহিদা জানিয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড থেকে প্রত্যয়নপত্র বিপিসিতে পাঠানো হয়েছে।

বিপিসি কর্মকর্তারা আরো জানান, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে ৫৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭৩০ মেট্রিক টন বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল প্রয়োজন পড়েছিল। এর মধ্যে ডিজেলের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৮ শতাংশ। আর ফার্নেস অয়েলের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ শতাংশ। এই দুই ধরনের জ্বালানিতে বিপিসি লোকসান দিলে পুরো প্রতিষ্ঠানই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে টানা কয়েক বছর জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় বিপিসি লাভের মুখ দেখেছিল। এখন আবারও লোকসান গুনতে শুরু করেছে। এর আগে ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছর থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত বিপিসি লোকসানি প্রতিষ্ঠান ছিল। ওই সময় সরকার ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ অব্যাহত রেখেছিল।



মন্তব্য