kalerkantho


অষ্টগ্রামের ঢালারকান্দি

গ্রাম বাড়ানোর নামে পাকা সড়ক দখল আ. লীগ নেতাদের!

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল   

১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



গ্রাম বাড়ানোর নামে পাকা সড়ক দখল আ. লীগ নেতাদের!

হাওরের মাঝখান দিয়ে যাওয়া ডুবোসড়কের ওপর মাটি ভরাট করে দখলের চেষ্টা চলছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত হাওর উপজেলা অষ্টগ্রামের ঢালারকান্দি গ্রাম। পাশে রয়েছে ছয় কিলোমিটার সরকারি পাকা সাবমার্জড রোড (ডুবোসড়ক)। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের স্থানীয় নেতারা সড়কের প্রায় আধাকিলোমিটার দখল করে নতুন করে ‘গ্রাম’ সৃজন করছেন। গত দুই মাস ধরে সড়কে মাটি ফেললেও এখন পর্যন্ত প্রশাসন আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা পাউবোর এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে ড্রেজারের অপারেটরদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে সরকারি রাস্তায় মাটি ভরাট করছেন।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর অফিস সূত্র জানায়, হাওর অঞ্চলের অবকাঠামো ও জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের (হিলিপ) আওতায় ২০১৬ সালে ‘ঢালারকান্দি গ্রাম উন্নয়ন সড়ক’ নামে এ রাস্তাটি তৈরি করা হয়। ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তাটি নির্মাণে খরচ পড়ে প্রায় চার কোটি টাকা।

সরেজমিন দেখা যায়, অষ্টগ্রামের পূর্ব অষ্টগ্রাম ইউনিয়নের ইকুরদিয়া গ্রাম লাগোয়া মেঘনা এবং কলমারবাঁক নদ সংস্কারে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজারে বছরব্যাপী মাটি কাটার কাজ চলছে। এ সুযোগে কলমা ইউনিয়নের ঢালারকান্দি গ্রাম সম্প্রসারণের জন্য স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতারা নদী ড্রেজিংয়ের বালু এনে গ্রামের পাশে ফেলছেন। বালু সুরক্ষায় দীর্ঘ প্রায় এক কিলোমিটার জায়গার দুই পাশে দোআঁশ মাটি দিয়ে উঁচু বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এ কাজ করতে গিয়ে ‘ঢালারকান্দি গ্রাম উন্নয়ন সড়ক’ প্রকল্পের পাকা ডুবোসড়কের প্রায় আধাকিলোমিটার জায়গা ঢেকে ফেলা হয়েছে।

সরকারি পাকা এ রাস্তাটি দখল করায় ইকুরদিয়া-লাখাই পথের যাত্রীরা সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। ঘটছে দুর্ঘটনাও। যানবাহন চলাচলেও সীমাহীন বিঘ্ন ঘটছে। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা রাস্তাটি দখল করায় এ পথে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করলেও হয়রানির ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না। এক সপ্তাহ ধরে এ পথে জনসাধারণের চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় স্থানীয় প্রশাসন অজ্ঞাত কারণে নির্বিকার রয়েছে।

অকাল বন্যায় ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে উপজেলার পূর্বাঞ্চলের শত শত শ্রমজীবী মানুষ জীবিকার তাগিদে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে এ সড়কেই পাড়ি জমায়। তাদের গ্রামে আসা-যাওয়ার প্রধান সড়ক এটাই।     

এলাকাবাসী জানায়, সহজে মাটি পেয়ে যাওয়ায় কলমা ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মজিদ ও তাঁর পিতা কলমা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজি মো. গাজী মিয়ার নেতৃত্বে কিছু দখলদার এ রাস্তার অন্তত এক কিলোমিটার জায়গা এরই মধ্যে ভরাট করে ফেলেছে। এ ছাড়া আছেন সাবেক মেম্বার মো. আব্দুল্লাহ, মিজানুর রহমান প্রমুখ। 

স্থানীয়রা আরো জানায়, সাধারণ গ্রামবাসীর কাছ থেকে গণচাঁদা তুলে জায়গাটির দুই পাশে এক্সকাভেটর দিয়ে মাটির চার-পাঁচ ফুট উঁচু ‘গাইড’ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে চাঁদার ব্যাপারে ঢালারকান্দির কয়েকজন অধিবাসীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তারা মুখ খুলতে রাজি হয়নি। মূল অভিযুক্তদের একজন যুবলীগ নেতা আব্দুল মজিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর পিতা ও আওয়ামী লীগ নেতা হাজি মো. গাজী মিয়া সরকারি রাস্তায় মাটি ভরাটের কথা স্বীকার করেন।

পাউবোর ড্রেজার সেকশনের অফিসার সেকান্দার আবু জাফর খান বলেন, ‘এমপি সাহেবের বরাত দিয়ে গ্রামবাসী মাটি চেয়েছে, তাই মাটি দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের লোকজন ওদের কাছ থেকে এক কাপ চা-ও খাননি।’

ড্রেজারের মাস্টার এস এম শাহাবউদ্দিন আলী জানান, গ্রামের নেতারা তাঁদের পুকুর ও কবরস্থান ভরাটের কথা বলায় তারা মাটি ফেলছেন। এ ছাড়া গ্রামের স্কুল ও মসজিদের পাশেও মাটি ফেলেছেন। অবশ্য পরে দেখতে পান, পাকা রাস্তাও মাটির নিচে চলে গেছে। এ বিষয়ে তিনি নেতাদের সঙ্গে কথাও বলেছেন। নেতারা তাঁকে জানান, মাটি ভরাটের পর রাস্তার জায়গা নাকি কেটে দেওয়া হবে।   

অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রকৌশলী মো. মাহবুব মোর্শেদ এ প্রসঙ্গে জানান, রাস্তা দখল করে গ্রাম নির্মাণের বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সালাহউদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, নতুন যোগদান করায় ঘটনাটি সম্পর্কে তিনি ভালোভাবে অবগত নন। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কিশোরগঞ্জ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা গ্রাম সম্প্রসারণের জন্য মাটি চাইছিলেন। দিতে রাজি না হলে তারা আমাদের ওপর ক্ষুব্ধ হন। পরে এমপি সাহেবের বরাত দিলে আমরা মাটি দিতে বাধ্য হই। তবে এ মাটি দিয়ে সরকারি রাস্তা ভরাটের খবর পাইনি।’

 



মন্তব্য