kalerkantho


জিয়া ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার আইনজীবী

আগেই অব্যাহতি দেওয়া উচিত ছিল

আদালত প্রতিবেদক   

২৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



আগেই অব্যাহতি দেওয়া উচিত ছিল

জিয়া ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিশেষ আদালতে গতকাল হাজিরা দেন খালেদা জিয়া। ছবি : কালের কণ্ঠ

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা মামলায় যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে তাঁর আইনজীবী বলেছেন, ওই টাকা খরচ করা হয়নি, ফেলে রাখা হয় নীতিমালা না থাকায়।

যুক্তিতে বলা হয়, খয়রাতি হিসেবে আসা ওই চার কোটি ৪৪ লাখ টাকার একটা অংশ নিয়েছেন তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান। আরেকটা অংশ গেছে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে। মোস্তাফিজুর রহমানের অংশ বাদ দিয়ে কেবল ট্রাস্টের অংশের জন্য মামলা করা হয়েছে। খালেদা জিয়াকে হয়রানি করার জন্যই মামলাটি করা হয়েছে। সে কারণে মামলায় দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পরই খালেদাকে অব্যাহতি দেওয়া উচিত ছিল উল্লেখ করে তার খালাস চেয়েছেন তাঁর আইনজীবী।

আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে গতকাল বুধবার নিজের চতুর্থ ও শেষ দিনে এই যুক্তি উপস্থাপন করে তাঁর প্যানেল আইনজীবীদের অন্যতম আবদুর রেজ্জাক খান। রাজধানীর বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরের মাঠে স্থাপিত ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ ড. আখতারুজ্জামানের আদালতে এই শুনানি হয়।

আইনজীবী আবদুর রেজ্জাক খান যুক্তি উপস্থাপন শেষ করার পর খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন। আজও তিনি আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করবেন।

গতকাল সকাল ১১টা ১৭ মিনিটে আদালতে হাজির হন খালেদা জিয়া। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়।

শুনানির শুরুতে রেজাক খান বলেন, ‘পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) দেখাতে পারেননি বেগম খালেদা জিয়া সোনালী ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলেছেন এবং টাকা তুলেছেন। শুধু তা-ই নয়, তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত ও মৌখিক কোনো প্রমাণও নেই। খালেদা জিয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন—মামলার কোনো সাক্ষী এ বিষয়ে কিছু বলেননি। মামলাটি একতরফাভাবে করা হয়েছে। যেটা নেই সেটাও এ মামলায় চেষ্টা করা হয়েছে।’

‘প্রাইমারি সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে মামলা প্রমাণ করতে হয়; এরপর ওরাল এভিডেন্স আসবে’—মন্তব্য করে খালেদা জিয়ার এই আইনজীবী বলেন, ‘এটা খয়রাতি টাকা। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান টাকাটা এনেছিলেন। তিনি কোনো রাস্তার লোক নন। টাকাটা কিভাবে এসেছে এটা আমরা দেখিয়ে দিয়েছি। চার কোটি ৪৪ লাখ টাকার একটা অংশ নিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান। আর একটা অংশ গেছে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে। মোস্তাফিজুর রহমান এ মামলায় অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কিন্তু শুধু একটি অংশের জন্য মামলা করা হয়েছে। খালেদা জিয়াকে হয়রানি করার জন্য মামলাটি করা হয়েছে।’

ওই আইনজীবী আরো বলেন, ‘আমরা টাকাটা খরচ করিনি, ফেলে রেখেছি। নীতিমালা করা হয় নাই তাই। ঘটনা ১৯৯৩ সালের।’ ‘২০০৭ সালে দুদকের মাথায় এমন কী বাজ পড়ল যে এই মামলা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে শুরু করল’—এই প্রশ্ন তুলে আইনজীবী রেজাক খান বলেন, ‘সারা দেশে এত মামলা থাকতে দুদক কেন এই মামলার বিষয়ে এত আগ্রহী?’ তিনি বলেন, ৪০৯, ১০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। কার বিরুদ্ধে কত ধারায় অভিযোগ সে বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে দেখাতে হয়। কিন্তু এখানে সব কিছু খালেদা জিয়ার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো।

তিনি আরো বলেন, ‘বিগত সেনাসমর্থিত সরকারের সময়ে এ মামলাটি করা হয়। এ সরকারের আমলেও তাঁর বিরুদ্ধে অনেক মামলা দেওয়া হয়েছে। মামলার ভারে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। খালেদা জিয়াকে জনসমক্ষে হেয় করার জন্য মানহানিকর বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাসীনরা, যা বিচারের ওপর হস্তক্ষেপের শামিল।’

‘এ ছাড়া এ মামলায় যে নথিপত্র দেওয়া হয়েছে সেটা স্বাক্ষরবিহীন, ঘষামাজা, কোনো তথ্য-উপাত্ত কিছুই নেই। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের কোনো কাগজপত্র তাঁরা প্রমাণ করেন নাই। সোনালী ব্যাংকের দপ্তর থেকেও কোনো কাগজপত্র দিতে পারেন নাই। তাঁরা বলেছেন, এই টাকা বিদেশ থেকে এসেছে এবং বণ্টন হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সঙ্গে কোনো ট্রানজেকশন হয়েছে, স্টেট টু স্টেট সেটা প্রমাণ করেতে পারেন নাই। বাংলাদেশ ব্যাংকে ফরেন কারেন্সি আসে; কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকও এটা সম্পর্কে অবগত নয়।’ 

শেষ পর্যায়ে এসে রেজাক খান বলেন, ‘আশা করি বেগম খালেদা জিয়া সব অভিযোগ থেকে খালাস পাবেন।’ তিনি বলেন, ‘এই মামলার প্রতিবেদনের সময়েই খালেদা জিয়াকে খালাস দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা বিশেষ কারণে করা হয়নি। আমি আশা করি, স্বাধীনভাবে আপনি (বিচারক) ন্যায়বিচার করবেন এবং তিনি খালাস পাবেন।’

শুনানির সময় আইনজীবীদের মধ্যে আরো ছিলেন মওদুদ আহমদ, এ জে মোহাম্মদ আলী, সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার। এ ছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় একটি মামলা করে দুদক। ২০১০ সালের ৫ আগস্ট তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের উপপরিচালক হারুন-অর-রশীদ। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

এ মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়াও অন্য আসামিরা হলেন মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।


মন্তব্য