kalerkantho


কবিরাজের ‘চিকিৎসা’য় কিশোরীর অকালমৃত্যু

অপচিকিৎসায় প্রাণক্ষয় ধুঁকছে বহু মানুষ

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল   

২৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



অপচিকিৎসায় প্রাণক্ষয় ধুঁকছে বহু মানুষ

তাসিরা খাতুন

এসিড জাতীয় তরল দাহ্য পদার্থের সঙ্গে ট্যালকম পাউডার মিশিয়ে পেস্ট বানানো হয়। পরে সেই পেস্ট পলিপ অপসারণের জন্য দেওয়া হয় নাকের ছিদ্রে। এতেও পলিপ অপসারণ না হলে কাঁচি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কাটা হয় সেই পলিপ। প্রচণ্ড যন্ত্রণার সঙ্গে শুরু হয় রক্তপাত। গ্রাম্য এক হাতুড়ে কবিরাজ কিশোরী তাসিরা খাতুনের ওপর চিকিৎসার নামে এমনই অত্যাচার চালায়।

সপ্তাহ ধরে নরকযন্ত্রণা ভোগের পর মেয়েটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৪ ডিসেম্বর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ ২৫ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে তাসিরার লাশের ময়নাতদন্ত ও একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করে। তবে পরিবারের শত চেষ্টার পরও অপচিকিৎসায় হত্যার অভিযোগ আমলে নেয়নি পুলিশ।

করুণ মৃত্যুর শিকার তাসিরা কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের হিলচিয়া ইউনিয়নের জনিদপুর গ্রামের দিনমজুর মো. রইছউদ্দিনের মেয়ে। অভিযুক্ত কথিত কবিরাজ মমতা বেগম (৪৪) হিলচিয়ার রাধাপুরের মৃত মো. বাচ্চু মিয়ার স্ত্রী। তিনি জনিদপুরের বাবার বাড়িতে থেকে কবিরাজি করেন। তবে ঘটনার পর মমতা বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।

সরেজমিনে জনিদপুরে গিয়ে জানা যায়, রইছউদ্দিন ও রোশনা খাতুন দম্পতির বড় মেয়ে তাসিরার (১৪) নাকে মাংসপিণ্ড (পলিপ) বাড়লেও টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছিল না পরিবার। তাসিরা গ্রামের প্রাইমারি স্কুল থেকে ২০১৫ সালের পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হলেও আর পড়াশোনা করেনি। গ্রামে মমতা বেগম নামের এক কবিরাজ আছে জেনে তাঁর দারস্থ হয় তাসিরার পরিবার। তাসিরার মা-বাবা, ভাই-বোনসহ এলাকাবাসী জানায়, পরে এক হাজার টাকা ফির (মজুরি) চুক্তিতে গত ১৫ ডিসেম্বর সকালে মমতা এসে তরল একপ্রকার পদার্থের সঙ্গে ট্যালকম পাউডার মিশিয়ে পেস্ট বানিয়ে তাসিরার নাকে ঠেসে দেন।

এক ঘণ্টা পর এসে নাকে দেওয়া ‘ঢিপা’ খোলার কথা থাকলেও সারা দিন মমতা আসেননি। এদিকে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকলে রাতে গিয়ে মমতাকে আনা হলে মমতা ‘কিছু হবে না’ বলে ফের নাকে একই পেস্ট লাগান। এভাবে সারারাত কান্নাকাটির পর পরদিন মমতাকে আবার আনা হলে মমতা আবারও অভয় দেন। এতেও মমতা চিকিৎসা থেকে বিরত না হয়ে উল্টো কাঁচি দিয়ে নাকের ভেতর খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পলিপ কাটার চেষ্টা করেন। এরপরই প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা তাসিরাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইলে মমতা বাধা দিয়ে বলেন, ‘তোমরা ডাক্তার, না আমি! কী করতে হইব আমি বুঝবাম। ছেরি (তাসিরা) মরলে আমি জওয়াব দিয়াম।’

তাসিরার মা বলেন, মমতা তাঁর মেয়েকে ডাক্তারের কাছে নিতে দেননি। তাঁর মেয়ে দিনের পর দিন যন্ত্রণায় কাতরায়। অসংলগ্ন কথা বলতে শুরু করে। মেয়ের মুখ ও মাথাসহ সারা শরীর ফুলে যায়। বমি করতে থাকে। পরে মমতার অগোচরে এলাকার পল্লী চিকিৎসক ডা. সামির হোসেনের কাছে যান। পরে সামির হোসেন এসে মেয়েকে ব্যথার ওষুধ দেন। ডা. সামির হোসেন কালের কণ্ঠকে জানান, মমতাই তাসিরার নাকের চিকিৎসা করেছেন। মেয়েটির অসুস্থতার খবর পেয়ে তিনি গিয়ে কেবল ব্যথার ওষুধ দিয়েছেন।

পরিবার সূত্র জানায়, টানা পাঁচ দিন এভাবে রক্তক্ষরণের একপর্যায়ে মেয়েটি দুর্বল হয়ে নেতিয়ে পড়ে। পরে ২১ ডিসেম্বর তাসিরাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় বাজিতপুর জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে পরদিন ২২ ডিসেম্বর তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ২৩ ডিসেম্বর রাতে তাসিরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ছাড়পত্রে বলা হয়, তাসিরা মেটাবোলিক এসিডোসিসে মস্তিষ্কে জটিলতা ও নাসারন্ধ্রে রক্তক্ষরণজনিত রোগে ভুগছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে দেওয়া মৃত্যুর সনদপত্রে বলা হয়, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাসিরা মারা গেছে।

তাসিরার যন্ত্রণা দেখে গ্রামবাসী অনেকেই মমতার অপচিকিৎসা ঠেকানোর চেষ্টা করে তার সঙ্গে তর্কে জড়ায়। এদের মধ্যে তাসিরার চাচা মো. মালম, প্রতিবেশী গৃহবধূ সোমা আক্তারসহ গ্রামবাসী কালের কণ্ঠকে মমতার অপচিকিৎসার বর্ণনা দেয়।

সরেজমিনে জনিদপুর গিয়ে জানা যায়, গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র ও অসচেতন মানুষের দুর্বলতাকে পুঁজি করে মমতা দীর্ঘদিন ধরে পাইলস ও পলিপ অপসারণের ‘চিকিৎসা’ করে আসছেন। জনিদপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে পলিপ ও পাইলস রোগীদের নানা কায়দায় ফাঁদে ফেলে মমতা ‘চিকিৎসা’ করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিলেন। তাসিরা ছাড়াও তাঁর অপচিকিৎসায় নিকলীর ছাতিরচর গ্রামের এক গৃহবধূ মৃত্যুবরণ করেন বলে গ্রামবাসী জানায়। জনিদপুর গ্রামের আরো এক কিশোরী পলিপ রোগী ও এক যুবক পাইলস রোগী মমতার অপচিকিৎসায় মরতে বসেছিল।

সরেজমিনে মমতার বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। বাড়িতে অবস্থানরত ঝরনা নামের এক কিশোরী জানায়, তার খালা মমতা কোথায় আছে সে জানে না। গতকাল বুধবার মুঠোফোনে মমতা জানান, তিনি তাসিরার চিকিৎসা করেছিলেন। দুই দিনে পলিপ পড়ে গিয়েছিল। পরে অন্য কোনো ডাক্তারের কাছ থেকে ওষুধ এনে খাওয়ায়। এর পরই মেয়েটি বমি করে। তার অপচিকিৎসায় তাসিরার নাকে রক্ত ঝরেনি এবং মারাও যায়নি বলে মমতা দাবি করেন। তা ছাড়া মেয়ের বাবার অনুরোধেই তিনি মেয়েটির চিকিৎসা করেছিলেন বলেও দাবি করেন।

হিলচিয়ার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাজহারুল হক নাহিদ জানান, কবিরাজের অপচিকিৎসার কারণেই মেয়েটি মারা গেছে। গ্রামবাসী তাঁকে বলেছেন, হাতুড়ে কবিরাজ মমতা বেগমই মেয়েটির নাকের পলিপ অপসারণ করতে এসিডজাতীয় পদার্থ লাগায়। তিনি জানান, এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নিতে তিনি থানার ওসিকে অনুরোধ করেছেন। ওসি তাঁকে বলেছেন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাজিতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এইচ আর সরকার (উত্তম) এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কেবল নাক-কান-গলা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়া আর কোনো চিকিৎসকের এ ধরনের রোগীদের চিকিৎসার এখতিয়ার নেই। হাতুড়ে ডাক্তার বা করিবাজের চিকিৎসা করার তো কোনো সুযোগই নেই! এটা জঘন্যতম অপরাধ। তাসিরার মৃত্যুর জন্য নিশ্চিতভাবেই হাতুড়ে ডাক্তার দায়ী। ভ্রাম্যমাণ আদালতেই এ ধরনের অপরাধীর বিচার করা সম্ভব।’

বাজিতপুর থানার ওসি আবু শামা মো. ইকবাল হায়াত মামলা না নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার না করে বলেন, তাসিরার শরীরে কোনো জখমের চিহ্ন ছিল না। ডাক্তার ছাড়া ওর মৃত্যুর কারণ আর কেউ বলতে পারবে না। তা ছাড়া পরিবারের কেউ মামলা দিতেও আসেননি।



মন্তব্য