kalerkantho


রাজশাহীতে চিনি দিয়ে তৈরি হচ্ছে খেজুর গুড়

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

২৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মঙ্গলবার সকাল ৯টা। রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বাঁশপুকুরিয়া গ্রামের একটি বাড়ির উঠানে তখন তৈরি হচ্ছিল খেজুর গুড়। চুলার ওপর খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে লাল আকার ধারণ করার পর যখন গুড়ে পরিণত হচ্ছিল, ঠিক তখনই ঢালা হলো কেজি পাঁচেক চিনি। গুড়ের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে দেওয়া হলো। গুড়-চিনি মিশে ভেজাল খেজুর গুড়ে পরিণত হলো। রাজশাহীর পুঠিয়া, দুর্গাপুর, বাঘা, চারঘাট, বাগমারায় এভাবে প্রতিদিন হাজার হাজার কেজি খেজুর গুড় উৎপাদন করা হচ্ছে চিনি মিশিয়ে। এতে করে প্রতারিত হচ্ছে ভোক্তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাজারে চিনির দামের চেয়ে খেজুর গুড়ের দাম বেশি হওয়ায় পাঁচ-সাত বছর ধরে এই প্রক্রিয়ায় খেজুর গুড় উৎপাদন করছে চাষিরা। বলা যায়, রাজশাহীর বাজারে যেসব খেজুর গুড় এখন পাওয়া যাচ্ছে তার ৯৯ শতাংশই চিনি মেশানো।

রাজশাহী সিভিল সার্জন সঞ্জিত কুমার সাহা বলেন, এই ভেজাল গুড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। কিন্তু ভোক্তারা যেহেতু প্রতারিত হচ্ছে, প্রশাসনের উচিত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শীত যত বেশি হয়, খেজুর গাছ থেকে রস তত বেশি পাওয়া যায়। এবার শীতের পরিমাণ শুরু থেকেই অনেক কম। ফলে খেজুরগাছ থেকে রসের পরিমাণও কম হচ্ছে। আবার আগের মতো ঝোপঝাড় না থাকায় খেজুরগাছও কমে গেছে অনেক হারে। ঝোপঝাড়ের সঙ্গে রাজশাহীতে অসংখ্য খেজুরগাছ কেটে ফেলা হয়েছে। দেখা গেছে, আগের চেয়ে রসের পরিমাণ কমে গেলেও বাজারে গুড়ের সরবরাহ উল্টো বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো খেজুরের রসের সঙ্গে চিনি মেশানো।

রাজশাহীর দুর্গাপুরের মাড়িয়া গ্রামের কৃষক আকবর বলছিলেন, ‘খেজুরের রস গাছ থেকে সংগ্রহ করে এক কেজি গুড়ে পরিণত করতে যে পরিমাণ খরচ এখন হচ্ছে তাতে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। কারণ হলো জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া। তাই বেশির ভাগ কৃষকই রস জ্বাল করার সময় তাতে চিনি দিচ্ছে।’ ওই কৃষক আরো বলেন, ‘এক কেজি গুড়ে অন্তত আধাকেজি চিনি মেশানো হচ্ছে এখন। সেই হিসাবে ১০ কেজি আসল গুড়ের সঙ্গে অন্তত পাঁচ কেজি চিনি মেশানো হচ্ছে। এতে করে পাঁচ কেজি চিনি গুড়ের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করে অন্তত ৬০ টাকা বাড়তি লাভ হচ্ছে।’

দুর্গাপুরের আমগাছী গ্রামের কৃষক বুলবুল হোসেন বলেন, শতকরা ৯৯ জনই এই প্রতারণা করলেও তিনি এ পথে পা বাড়াননি।

রাজশাহীর খেজুর গুড়ের হাটের মধ্যে জেলার দুর্গাপুর বাজার অনেকটা বিখ্যাত। এই বাজারে সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। প্রতি হাটে অন্তত ৫০ টন গুড় এসে জমা হয়। এই হাটের গুড় যায় ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মানিক হোসেন বলেন, বাজারে এখন প্রায় সব গুড়েই চিনি মেশানো থাকে। তাতে যে চিনি মেশানো থাকছে, তা তারা টের পাচ্ছেন না। ফলে গুড়ের দামে চিনি কিনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা দিয়ে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ইশরাত জাহান বলেন, কী পরিমাণ গুড় রাজশাহীতে উৎপাদিত হয় এর কোনো তথ্য রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরে নেই। এমনকি চিনি মেশানোর বিষয়টি জানা নেই বলেও দাবি করেন ওই কর্মকর্তা।



মন্তব্য