kalerkantho


তুষ, খড়, কচুরিপানায় হবে জৈব জ্বালানি

পেট্রল, অকটেনের সঙ্গে ৫% মিশিয়ে ব্যবহার করা হবে যানবাহনে

আবুল কাশেম ও আরিফুজ্জামান তুহিন   

১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



একসময় চালের খুদ বিক্রি হতো বাজারে। যাদের চাল কেনার সামর্থ্য ছিল না, তারা সেসব কিনত রান্নার করে খাওয়ার জন্য। এখন দেশে দারিদ্র্য কমেছে। ভাঙা চালের কণা বা চালের খুদের ভাত সচরাচর দেখা যায় না কোনো বাড়িতেই। সেই খুদ এখন যাবে বায়ো-ইথানল প্ল্যান্টে, তৈরি হবে জ্বালানি তেল, যা ব্যবহার হবে যানবাহনে। ইতিমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বায়ো-ইথানল বা জৈব জ্বালানি প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে এবং সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে। জৈব জ্বালানি উৎপাদনে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ উন্মুক্ত করতে গত ১২ ডিসেম্বর একটি নীতিমালা জারি করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।

শুধু চালের খুদ নয়, তুষ, ভুট্টার গাছ, আখের ছোবড়া, ধানের খড়, গাছের বাকল, শহরের বর্জ্য, বিভিন্ন সবজির পরিত্যক্ত অংশ, কচুরিপানা, বিট, জলজ ও বনজ নরম উদ্ভিদ ব্যবহার করেও উৎপাদন করা হবে জৈব জ্বালানি।

এ ছাড়া আমদানি করা ভুট্টার দানা, ঝোলা গুড়, পুরনো সংবাদপত্র, সুতা তৈরির কারখানায় বাতিল হওয়া সুতা ও তুলা, সুইস গ্রাসও কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে বায়ো-ইথানল প্ল্যান্টে। এ ধরনের প্ল্যান্টে জৈব কাঁচামাল ব্যবহার করে ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত মানের একপ্রকার রাসায়নিক দ্রব্য উৎপন্ন হয়, যা জ্বালানি ও জ্বালানি সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, জীবাশ্ম জ্বালানি দহনের ফলে সৃষ্ট দূষণ কমানোর জন্য বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারে গুরুত্বারোপ করেছে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ফলে দেশে বিকাশমান শিল্প খাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জ্বালানি সহায়ক পণ্য হিসেবে ইথানল উৎপাদন ও বায়ো-ইথানল প্ল্যান্ট স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে পেট্রল ও অকটেনের সঙ্গে ৫ শতাংশ বা সরকার নির্ধারিত গ্রহণযোগ্য মাত্রার বায়ো-ইথানল মিশিয়ে যানবাহনে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তাই বায়ো-ইথানল উৎপাদন, প্ল্যান্ট স্থাপন ও ব্যবহারের বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। জ্বালানি তেল, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানি, মজুদ ও সংরক্ষণসহ যেকোনো ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের আগাম অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

বিশ্বের ধনী দেশগুলো উৎপাদিত খাদ্যপণ্যকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে জৈব জ্বালানি তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের চড়া দামের জন্য ওই সব দেশকে দায়ী করা হয়। তবে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা যেন ঝুঁকিতে না পড়ে, সে জন্য এ দেশের মানুষ খাবার হিসেবে খান—এমন পণ্যকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এ ছাড়া, সরাসরি কোনো সবজি কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। ফলে বায়ো-ইথানল প্লান্টের কারণে বাংলাদেশের ভোগ্য পণ্যের বাজারে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চালের খুদ, ভুট্টা সাধারণত এখন পোল্ট্রি, মাছ ও পশুখাদ্য উৎপাদনকারী শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে আমদানি করা ভুট্টার দানা বায়ো-ইথানল প্লান্টে ব্যবহার করা যাবে। দেশে উৎপাদিত ভুট্টা ব্যবহার করা যাবে না। দেশে বর্তমানে প্রায় ১৭ লাখ টন খুদ উৎপাদন হয়, ভুট্টা হয় ২২ লাখ টন ও চিটাগুড় হয় ১০ লাখ টন।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বায়ো-ইথানল প্লান্টগুলো ভুট্টার দানা বাদে অন্যসব কাঁচামাল দেশের ভেতর থেকে সংগ্রহ করবে। ভুট্টার দানা বিদেশ থেকে আমদানি করবে। স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সংগ্রহে সমস্যা হলে বিদেশ থেকেও আনতে পারবে। কাঁচামাল হতে উৎপাদিত বায়ো-ইথানল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির মনোনীত প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করতে হবে। বিপিসির চাহিদা না থাকলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে তা নিজ উদ্যোগে ও ব্যবস্থাপনায় বিদেশে রপ্তানি করতে হবে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৬ সালের ১৪ আগস্ট ‘পেট্রল ও অকটেনে বায়ো ইথানল মিশ্রণ করার যৌক্তিকতা বিষয়ে’ একটি কমিটি করা হয়। পাঁচ সদস্যের ওই কমিটি ২০১৬ সালের ৬ অক্টোবর সরকারের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে সাতটি সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো, পেট্রল ও অকটেনে ৫ শতাংশ বায়ো-ইথানল ব্যবহার করা যেতে পারে। বায়ো-ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি তেলের মূল্য এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে এর দাম যৌক্তিক থাকে। খাদ্য নিরাপত্তার ওপর যাতে বিরূপ প্রভাব না পড়ে সে জন্য সীমিত সংখ্যায় বায়ো-ইথানল প্লান্ট স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

জানা গেছে, সুনিপুণ অর্গানিক্সসহ কয়েকটি বেসরকারি কম্পানি বায়ো-ইথানল প্লান্টে বিনিয়োগের জন্য সরকারের অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেছে। অনুমতি দিলে তারা বেশ কয়েকটি প্লান্ট করবে।



মন্তব্য