kalerkantho


মিলু গোমেজ হত্যা

অসুস্থ অনিলই পুলিশের ভরসা!

২ দিন পর সেই জুতা জব্দ, দরজা পরীক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রাজধানীর মহাখালীর আরজতপাড়ায় খ্রিস্টান বৃদ্ধা মিলড্রেড গোমেজ ওরফে মিলু গোমেজ হত্যার রহস্য তিন দিনেও উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। নিহতের স্বামী ও ভারসাম্যহীন বৃদ্ধ অ্যাডওয়ার্ড অনিল গোমেজকে ঘিরেই তদন্ত করছে পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রাথমিকভাবে সন্দেহভাজন অনিলের কাছ থেকেই জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। তবে স্ত্রীর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল অনিল গতকাল রবিবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। স্বজনরা জানিয়েছেন, নিজে চলাচল করতে না পাড়ায় অনিলকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এদিকে কালের কণ্ঠে প্রতিবেদন প্রকাশের পর গতকাল দরজায় পরে থাকা দুই জোড়া জুতা জব্দ করেছে পুলিশ। গত শুক্রবার এসব জুতা ব্যাগে ভরে পাশের বাসায় ফেলে রেখে যায় তদন্তকারীরা। এ ছাড়া ঘটনার দুই দিন পর গতকাল বিকেলে পুলিশ কর্মকর্তারা অনিল ও মিলুর বাসার দরজাটি পরীক্ষা করে দেখেছেন।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার সাত্যকি কবিরাজ ঝুলন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়েই তদন্ত করছি। এখানে বৃদ্ধই আমাদের বেশি সাহায্য করতে পারবেন। তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। তাই একটু অপেক্ষা করতে হচ্ছে।’ তিনি জানান, ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা আলামতগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে খুনের ক্লু খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় পুলিশ এখনো কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করেনি। তবে পুলিশের আরেকটি সূত্র জানায়, শুক্রবার রাত থেকে কিরণ নামে এক যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তিনি বাসায় বাজার করে দিতেন। পাশের আরেকটি ভবনে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করেন কিরণ। খ্রিস্টান কিরণের বাড়ি মাদারীপুরের রাজৈরে।

গতকাল আড়জতপাড়ার ৩৮/এইচ নম্বর বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, দুপুরেই অনিলকে মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কিডনি বিভাগের চিকিৎসকের অধীনে নেওয়া হয়েছে। গত শনিবার তাঁর সাপ্তাহিক একটি ইনজেকশন দেওয়ার কথা ছিল। স্ত্রী খুনের কারণে সেটি সম্ভব হয়নি।

অনিলের শ্যালক ও মিলুর ভাই হেনরী গোমেজ জানান, গতকাল সকালে অনিল নিজে বিছানা থেকে উঠতে পারছিলেন না। স্ত্রী মিলু খাবার দিয়ে বা অন্য সব কাজে সহায়তা করলেও অনিল নিজে আস্তে আস্তে চলাচল করতে পারতেন।

মিলুর বোন শেলি রিটা প্যারেরা জানান, গতকাল সকালে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফারুক-উল-ইসলাম গিয়ে পাশের আইনজীবীর বাসা থেকে দুই জোড়া জুতা নিয়ে যান। ঘটনার দিন ব্যাগে ভরে পুলিশ জুতাগুলো ওই বাসায় ফেলে যান।

গতকাল বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, তদন্তকারীদের একটি দল মিলুর বাসার দরজাটি পরীক্ষা করে দেখছেন। দুই দিন পর তারা বোঝার চেষ্টা করছে ভেতর থেকে এটি খোলা হয়েছে নাকি বাইরে থেকে! গতকাল র‌্যাবের কর্মকর্তাদেরও তথ্য সংগ্রহ করতে দেখা যায়। তদন্তকারীরা বলেছেন, বিভিন্ন দিকে কাজ চলছে।

মামলার বাদী হেনরী গোমেজ বলেন, ‘পুলিশ আমাদের কিছু জানায়নি। কিছু পেয়েছে কি না আমি জানি না। আমার ভাগ্নেরা আসতে আরো দু-এক দিন লাগবে। তারা আসলে বড় অফিসারদের কাছে যাব।’

স্বজন, প্রতিবেশী ও পুলিশের সূত্র জানায়, মিলু গোমেজ হত্যার আলামতে ব্যাপক রহস্য তৈরি হয়েছে। নিহতের স্বামীকে ঘরে একা পাওয়া গেছে, যিনি দরজা খুলে দেন। তবে তাঁর পক্ষে তুলনামূলক শক্তিশালী ও সুস্থ স্ত্রীকে গলাকেটে হত্যা করা কঠিন। অনিলের মানসিক ও শারীরিক শক্তি ক্ষীণ। এর পরও অনিল বিকারগ্রস্ত হয়ে খুন করেছেন কি না তা যাচাই করছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা ছুরি, মোবাইল ফোন এবং দরজা থেকে পাওয়া দুই জোড়া জুতা থেকে পাওয়া গেছে আরেক রকম তথ্য। আবার নিহতের শোবার ঘরের আলমারিও ছিল তছনছ। অনিল ও মিলুর চার ছেলে বিদেশে থাকায় তাঁরাই বাড়িতে থাকতেন। তাঁদের বাড়ির নিরাপত্তাব্যবস্থা বলে কিছুই ছিল না। বাড়িতে ছিল মাদকসেবীদের আড্ডা। ভাড়া তোলাসহ আর্থিক বিষয়ের লেনদেনও আছে। সম্পত্তির সব বিষয় তদারকি করতেন নিহত মিলু। জমি-ফ্ল্যাটসহ অনেক সম্পদ আছে তাঁর। ফলে জমি দখল, লুট ও সম্পত্তির বিরোধসহ অনেক কারণেই এই খুন হতে পারে। একটি সূত্র জানায়, দুই বছর আগে মিলুদের বাড়ির সামনের ভবনেই আরেকটি খ্রিস্টান পরিবারের ওপর হামলা হয়। সেই রহস্য এখনো অজানা। ফলে ঘটনাটি কোনো উগ্রপন্থীদের কাজ কি না সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার সকালে মিলু গোমেজের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে গৃহকর্মী ও ভাড়াটিয়ারা দীর্ঘ সময় দরজা ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করলে একপর্যায়ে দরজা খুলে দেন বৃদ্ধ অনিল। তিনি শোফায় বসলে তাঁর সামনে মেঝেতে সবাই মিলুর জবাই করা লাশ দেখতে পান।



মন্তব্য