kalerkantho


শ্রম আইন সংশোধনের খসড়া তৈরি

তদন্তে প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত মামলা আমলে নয়

আবুল কাশেম   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



তদন্তে প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত মামলা আমলে নয়

ক্রেতাগোষ্ঠী ও বিশ্ব শ্রম সংস্থার চাপে শ্রম আইন-২০০৬ সংশোধনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন থাকছে। বিদ্যমান আইনে ‘কম্পানির অপরাধ’ বিষয়ক ধারায় শুধু একটি ‘না’ শব্দ যোগ এবং ১৭ শব্দের একটি শর্ত জুড়ে দিয়ে কম্পানির অপরাধ থেকে মালিকদের দায়মুক্তির ব্যবস্থা থাকছে সংশোধিত আইনে।

বলা হয়েছে, তদন্ত করে অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত কম্পানি বা ফার্মের কোনো পরিচালক, অংশীদার ও ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে মামলা আমলে নেওয়া যাবে না। তবে শ্রমিকদের স্বার্থে এমন কোনো বিধান থাকছে না।

বিদ্যমান আইনে কোনো কম্পানি বা ফার্মের বিরুদ্ধে আইন ভঙ্গের অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় সরাসরি সম্পৃক্ত পরিচালক, অংশীদার ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ওই অপরাধ করেছেন বলে গণ্য করা হয়। সংশোধিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, অপরাধটি তাঁদের জ্ঞাতসারে বা সম্মতিতে হয়েছে কি না তদন্তে তা প্রমাণ না হলে ওই অপরাধ তাঁরা করেছেন বলে গণ্য হবে না।

বিদ্যমান শ্রম আইনের ৩১২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘যে ক্ষেত্রে এই আইন বা কোন বিধি, প্রবিধান বা স্কিমের অধীন কোন অপরাধী কোন কোম্পানি বা অন্য কোন সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা কোন ফার্ম হয় সে ক্ষেত্রে উহার কর্ম পরিচালনার ব্যাপারে সক্রিয়ভাবে জড়িত উহার প্রত্যেক পরিচালক, অংশীদার, ব্যবস্থাপক, সচিব বা অন্য কোন কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি উক্ত অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন; যদি না তিনি প্রমাণ করিতে পারেন যে, অপরাধটি তাহার জ্ঞাতসারে বা সম্মতিক্রমে হয় নাই বা ইহা রোধের জন্য তিনি সাধ্যমতো চেষ্টা করিয়াছিলেন। ’

সংশোধিত ৩১২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘যে ক্ষেত্রে এই আইন বা কোন বিধি, প্রবিধান বা স্কিমের অধীন কোন অপরাধী কোন কোম্পানি বা অন্য কোন সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা কোন ফার্ম হয় সে ক্ষেত্রে, উহার কর্ম পরিচালনার ব্যাপারে সক্রিয়ভাবে জড়িত উহার প্রত্যেক পরিচালক, অংশীদার, ব্যবস্থাপক, সচিব বা অন্য কোন কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি উক্ত অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন না, যদি না প্রয়োজনীয় তদন্ত সাপেক্ষে প্রমাণিত হয় যে অপরাধটি তাহার জ্ঞাতসারে বা সম্মতিক্রমে সংঘটিত হইয়াছে। তবে শর্ত থাকে যে, তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোন পরিচালক, অংশীদার বা ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে মামলা আমলে নেওয়া যাইবে না। ’

তাজরীন ফ্যাশনসে ২০১২ সালে অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানাটির মূল ফটকে তালা থাকায় শ্রমিকরা কারখানা থেকে বের হতে পারেনি। ফলে আগুনে পুড়ে মারা যায় ১১১ জন শ্রমিক।

ওই ঘটনায় কারখানার মালিক দেলোয়ার হোসেনকে আসামি করে ‘অপরাধজনক নরহত্যা’র অভিযোগে মামলা হয়। তাতে শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য অভিযুক্ত করা হয়নি, অভিযুক্ত করা হয়েছে শ্রম আইন লঙ্ঘন করে গেটে তালা ঝুলিয়ে রাখায়। গেট বন্ধ থাকার কারণেই ভেতরে আগুনে পুড়ে মরতে হয়েছে শ্রমিকদের।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই ঘটনায় কারখানার মালিক দেলোয়ার হোসেন ও তাঁর স্ত্রী মাহমুদা আক্তারের বিরুদ্ধে মামলা হলে সরকারের ভেতরে প্রভাব খাটাতে থাকেন পোশাক খাতের মালিকরা। তাঁদের বক্তব্য, মালিকরা কারখানা পরিচালনা করেন না। তাঁরা কারখানায় বসে অফিসও করেন না। তাই কারখানায় শ্রম আইনবিরোধী কিছু ঘটলে তার জন্য মালিকদের দায়ী করা যাবে না। বরং যে কর্মকর্তা-কর্মচারী শ্রম আইনবিরোধী কার্যক্রম সম্পন্ন করেন, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। মালিকদের কঠোর অবস্থানের কারণেই শ্রম আইন সংশোধনে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। ’

গত ২১ নভেম্বর শ্রম আইন সংশোধন নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু ও পোশাক খাতের মালিকরা বৈঠক করেন। পরে আইনমন্ত্রী জানান, জাতীয় সংসদের আগামী শীতকালীন অধিবেশনে সংশোধিত শ্রম আইন বিল আকারে উত্থাপন করা হতে পারে।

 

জেনেভায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ অনুচ্ছেদ যুক্ত করে আইএলও। তাতে শ্রম আইনে সংশোধনী আনা, ইপিজেডে ট্রেড ইউনিয়ন চালু করা, ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধনে স্বচ্ছতা আনাসহ বেশ কিছু শর্ত দেওয়া হয়। তবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। ফলে ওই বিশেষ অনুচ্ছেদটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে শ্রম আইনে কিছু সংশোধনী আনা হচ্ছে। সেগুলো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত করা হবে। ’

খসড়া পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সংশোধনীতে ৩৪৮ক নামে নতুন একটি ধারা যুক্ত করা হচ্ছে। তাতে সরকার ‘ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ’ (টিসিসি) নামে একটি পরিষদ গঠন করতে পারবে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী এই পরিষদের প্রধান হবেন। এ ছাড়া পরিষদে সরকারপক্ষ, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষের ২০ জন করে প্রতিনিধি থাকবেন। শ্রম বিষয়ক কোনো আইন, বিধিমালা, নীতি প্রণয়ন ও সংশোধনের বিষয়াদি এই পরিষদ পর্যালোচনা করবে। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বা শিল্পসম্পর্কিত যেকোনো বিষয় পর্যালোচনার জন্য এই পরিষদে উপস্থাপন করা যাবে।

বিদ্যমান আইনে কোনো শ্রমিক বা মালিক বেআইনি ধর্মঘট বা লক-আউট শুরু করলে বা প্ররোচিত করলে শাস্তি হিসেবে এক বছরের কারাদণ্ড কমিয়ে ছয় মাস করার কথা বলা হয়েছে খসড়ায়। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কোনো ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম চালালে ছয় মাসের কারাদণ্ড কমিয়ে তিন মাস, একই ব্যক্তি একসঙ্গে একাধিক ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে ছয় মাসের কারাদণ্ড কমিয়ে এক মাস করার প্রস্তাব রয়েছে।

বিদ্যমান আইনে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর তহবিল সংগ্রহে কোনো বিধি-নিষেধ নেই। খসড়ায় এ ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। খসড়ায় ১৭৯ ধারায় দুটি দফা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ট্রেড ইউনিয়নের তহবিলের উত্স এবং ওই তহবিল কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে তার বর্ণনা থাকতে হবে। তবে শর্ত থাকে যে ইউনিয়নের চাঁদা বাদে সরকারের অনুমতি ছাড়া দেশি-বিদেশি অন্য কোনো উত্স থেকে অর্থ সংগ্রহ করা যাবে না। নির্ধারিত খাত ছাড়া অন্য কোনো খাতে ব্যয়ও করা যাবে না।


মন্তব্য