kalerkantho


জাতিগত নিধনযজ্ঞের বিচার

আইনগত বিষয় খতিয়ে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র

রোহিঙ্গা নিধন ছিল পরিকল্পিত ধারাবাহিক ও সমন্বিত

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

২৪ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর অভিযানকে এরই মধ্যে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এখন ভয়াবহ ওই অপরাধের বিচার প্রশ্নে তারা বলেছে, এ বিষয়ে আরো বিশদ আইনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন গত বুধবার সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এরপর রাতে ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র দপ্তরে এ বিষয়ে টেলিকনফারেন্সে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, যুক্তরাষ্ট্র কি মিয়ানমার বাহিনী ও তাদের দোসরদের ভূমিকাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ ও ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে?

প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনে স্পষ্ট কিছু না থাকলেও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ ও ‘গণহত্যার’ মতো বিষয়ে ব্যাপক আইনি ফলের কথা বলা আছে। সব শেষে আদালতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যেমনটি আমরা বসনিয়ায় ম্লাদিচের (রাতকো ম্লাদিচ) ক্ষেত্রে দেখেছি। ”

ওই কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত অপরাধগুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আরো যে বিশ্লেষণ করছে তার ফলাফল বিষয়ে আগে থেকেই কিছু বলার সুযোগ নেই। পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করা অব্যাহত রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ বললেও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ বা ‘গণহত্যা’ বলছে না।

রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানোর দায়ে মিয়ানমারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ব্যবস্থা সম্পর্কে পররাষ্ট্র দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের বেসামরিক সরকারকে শাস্তি দিতে চায় না। বেসামরিক সরকার দেশকে গণতন্ত্রায়নে সফল হলে এর সুবিধা সংঘাতে লিপ্ত গোষ্ঠীগুলোসহ সবাই পাবে। দেশটিতে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধ চলছে।

প্রায় ১৩৫টি নৃগোষ্ঠী বহু পুরনো বিবাদ মীমাংসা করতে চাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওই কর্মকর্তা বলেন, অতীতে পুরো মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্দেশ্য ছিল সামরিক জান্তাকে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য করা। এরই মধ্যে এটি হয়েছে। এখন বেসামরিক সরকারকে গণতন্ত্রায়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিতে হবে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, “২০০৮ সালের ‘জেএডিই আইনের’ আওতায় মিয়ানমারের সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞাসহ বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা এখনো আছে। ওই নিষেধাজ্ঞার কারণে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা এখন সীমিত। আমি মনে করি, সাম্প্রতিক সহিংসতার (রোহিঙ্গাদের ওপর) জন্য দায়ী ব্যক্তিবিশেষকে লক্ষ্য করে আমরা ‘জেএডিই আইনের’ বাইরেও কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বিবেচনা করছি। ”

টেলিকনফারেন্সে যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলেন, তাঁরা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হয়েই কথা বলছেন। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতির তথ্যগুলো বিশদভাবে ও সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করে পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও নিষ্ঠুরতা বোঝাতেই যুক্তরাষ্ট্র একে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ আখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা ও আগ্রহ দেখতে পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, রোহিঙ্গা নিধন ও বাস্তুচ্যুতি ছিল সুপরিকল্পিত, ধারাবাহিক ও সমন্বিত সিদ্ধান্তের ফল।

পররাষ্ট্র দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘কোনো সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী নয়, বরং বেশ কিছু গোষ্ঠী ওই পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে। ’

আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, রাখাইন রাজ্যে সংঘাতের পেছনে বেশ কিছু গোষ্ঠীর ভূমিকা থাকতে পারে। এর মধ্যে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের কথা পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনও বলেছেন। তবে নিশ্চিতভাবে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের অনেক ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানোর অভিযোগগুলোর স্বাধীন, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত চায় যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে যে আগ্রহ দেখাচ্ছে তা বাস্তবায়নেও মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সমর্থন ও সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


মন্তব্য