kalerkantho


‘এপার-ওপারের বাহিনীর মধ্যে কত পার্থক্য!’

তোফায়েল আহমদ, রোহিঙ্গা শিবির ঘুরে    

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



‘এ দেশের সেনারা অনেক ভালো। ওই যে দেখেন, নদীর ওপারে আমাদের দেশ মিয়ানমার।

সেখানকার সেনারা আমাদের ওপর কী যে নির্যাতন করেছে! আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। নদী পার হয়ে এপারে এসেও দেখি সেনাবাহিনী। কিন্তু এরা আমাদের সেনাদের মতো বর্বর নয়, মানুষ মারে না, তাড়িয়ে দেয় না। বাংলাদেশের সেনারা আমাদের খাদ্য দিচ্ছে, ওষুধপত্রও দিচ্ছে। নদীর এপার-ওপারে একটা বাহিনীর মধ্যে কত পার্থক্য!’

কথাগুলো বলছিলেন সপ্তাহ দুয়েক আগে রাখাইন থেকে পালিয়ে কক্সবাজারের লেদা রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেওয়া বৃদ্ধ রশিদ আহমেদ। এত দিন ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা থাকায় ত্রাণ নিতে লাইনে দাঁড়ানোর সাহস পাননি তিনি। এখন সেনাবাহিনীর হাতে ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব যাওয়ার পর শৃঙ্খলা ফিরেছে। ফলে রশিদের মতো আরো অনেক বৃদ্ধ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ নেওয়ার সাহস পাচ্ছেন।

এত দিন উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরে ত্রাণ বিতরণে ছিল নানা অব্যস্থাপনা।

ত্রাণবাহী গাড়ির পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেক রোহিঙ্গা আহতও হয়েছে। সারা বেলা অপেক্ষা করে পুরনো রোহিঙ্গাদের ভিড়ে ত্রাণহীন শূন্যহাতে ফেরা রোহিঙ্গার সংখ্যাও কম ছিল না। এ ছাড়া ত্রাণ বিতরণে শৃঙ্খলা না থাকায় কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের দীর্ঘ অংশজুড়ে লেগে থাকত যানজট। এতে কম দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি যাত্রীদের।

গত দুই দিনে শিবিরের চেহারা অনেকটা পাল্টেছে। এখন রোহিঙ্গা শিবিরে ত্রাণের পেছনে ছোটাছুটি নেই, রাস্তায় যানজট নেই, ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগও নেই কারো।

গতকাল সকালে টেকনাফের লেদা মোচনী শিবিরের রোহিঙ্গা নারী আম্বিয়া খাতুন (৫০) সেনাবাহিনীর টোকেন নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ১০০ টাকা, তিন কেজি চাল, এক কেজি আলু, একটি বালতি ও মগ পান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর থেকে চিঁড়া, মুড়ি, রুটি ও বিস্কুট খেয়ে এত দিন কেটেছে। অনেক দিন হলো রান্না করা খাবার খাই না। আজ ১০০ টাকায় শুঁটকি মাছ, তরিতরকারি কিনে রান্না করে খাব। ’

একই শিবিরের বৃদ্ধ হাচু মিয়া (১১৫) ছেলের পিঠে চড়ে টোকেন নিয়ে ত্রাণের জন্য এসেছেন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এ বৃদ্ধ কথা বলতে পারছিলেন না। তাঁর ছেলে আব্দুল আমিন বলেন, ‘সেনাবাহিনী প্রথমে বাবার নামে একটি টোকেন দেয়। টোকেন নিয়ে গেলে বাবাকে সশরীরে উপস্থিত হতে বলে। পরে আমি বাবাকে কাঁধে করে নিয়ে আসি। ’

আব্দুল আমিন আরো বলেন, ‘বাবাকে কাঁধে নিয়ে ত্রাণের জন্য আসাটা কষ্টকর হলেও সেনাবাহিনীর এ নিয়মটা আমার কাছে ভালো মনে হয়েছে। কেননা, এত দিন কেউ একজন এসে একসঙ্গে চার-পাঁচটা নাম দিয়ে ত্রাণ নিয়ে যেত, কেউ আবার কিছু না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যেত। এখন সবাই পাচ্ছে, তাই সবাই খুশি। ’

শৃঙ্খলা ফিরে আসায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে ত্রাণ নিয়ে আসা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা। গতকাল কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য ৬০ হাজার টাকা ও ১০০ পরিবারের জন্য খাবার নিয়ে এসেছে মুন্সিবাড়ী সমবায় সমিতি। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণসামগ্রী নিয়ে প্রথমে জেলা ত্রাণ নিয়ন্ত্রণ কক্ষে নিবন্ধন করিয়ে লেদায় নিয়ে আসি। আমরা এর আগেও ত্রাণ নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু তখন এত সুন্দর পরিবেশ দেখিনি। এবার সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় ত্রাণ বিতরণে শৃঙ্খলা দেখে ভালো লেগেছে। ’


মন্তব্য