kalerkantho


মডেল থেকে জঙ্গি!

মেহেদীর ঘনিষ্ঠ অন্তত ২০ জন মাঠে সক্রিয়

রেজোয়ান বিশ্বাস   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



র‌্যাম্প মডেল থেকে জঙ্গি হওয়া মেহেদী হাসান ওরফে আবু জিব্রিল ধরা পড়লেও তাঁর ঘনিষ্ঠ নব্য জেএমবির অন্তত ২০ সদস্য মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছে বলে জানতে পেরেছে র‌্যাব। তাদের মধ্যে তৌহিদ, সাজিদ, কামাল ও অপু অন্যতম।

মেহেদীর কাছ থেকে উদ্ধার করা ল্যাপটপ থেকে এ তথ্য পেয়েছে র‌্যাব।

র‌্যাব জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে নব্য জেএমবির বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে আরো অনেক তথ্য দিয়েছেন মেহেদী। তিনি নব্য জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তাঁর সঙ্গে বিদেশি উগ্র-মৌলবাদী গোষ্ঠীর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তিনি বিদেশি জঙ্গিদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর মাধ্যমে বিদেশি জঙ্গি সংগঠনগুলো দেশে বিপুল অর্থ পাঠিয়েছে। সেই অর্থ দিয়ে মাঠপর্যায়ে নব্য জেএমবির সদস্য বাড়ানো এবং বোমা তৈরির পরিকল্পনা চলছিল।

মেহেদীকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য জানিয়ে র‌্যাব-৩-এর পরিচালক লে. কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, জঙ্গি মেহেদী হাসান নব্য জেএমবির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি ভিন্ন ধরনের জঙ্গি।

খুব কৌশলী। র‌্যাম্প মডেলিংয়ের আড়ালে জঙ্গি কার্যক্রম চালাতেন; যাতে সহজে কেউ তাঁর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বুঝতে না পারে। তাঁর ল্যাপটপ থেকে নব্য জেএমবি সম্পর্কিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, মেহেদীর সহযোগীদের গ্রেপ্তার করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ ওই জঙ্গিরাও ভয়ংকর প্রকৃতির। মেহেদীর কাছ থেকে এরা শপথ নিয়েছে। সেই শপথের একটি ভিডিও চিত্র এখন র‌্যাবের কাছে রয়েছে।

লে. কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ জানান, ওই ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে—মুখ বাঁধা কিছু তরুণ জঙ্গি একে অন্যের হাতে হাত রেখে শপথ করছে। এর মধ্যে একজন একটু আলাদা। আর সেই আলাদা ব্যক্তিই মেহেদী হাসান।

ভিডিওর তথ্য অনুযায়ী, মেহেদী তাঁর ঘনিষ্ঠদের হাতের ওপর হাত রেখে বলছেন, ‘বাইয়্যাত (শপথ) দিচ্ছি। আমি তাঁর (মেহেদী) কথা শুনব ও তাঁকে মান্য করব। সন্তুষ্টিতে অথবা অসন্তুষ্টিতেও আমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। ’

জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাব জানতে পেরেছে, নব্য জেএমবির সাবেক নেতা সারোয়ার-তামিম গ্রুপের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল। তাঁর নেতৃত্বে থাকা নব্য জেএমবির ব্রিগেড আদ-দার-ই কুতনীর সদস্যরা নিয়মিত তাঁকে ইয়ানত (অর্থ) দিত; যা পরে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতাদের নির্দেশে জঙ্গি কার্যক্রমে ব্যয় হতো। এ ছাড়া জঙ্গিবাদে অর্থায়ন করে এমন প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল তাঁর। প্রবাসীদের মধ্যে বেশির ভাগ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।

ব্রিগেড আদ-দার-ই-কুতনীর চারটি ভাগ রয়েছে বলে র‌্যাবকে জানিয়েছেন মেহেদী। এর মধ্যে রয়েছে আনসার (সাহায্যকারী), মুহাজির (যোদ্ধা), সালাফি আলেম বোর্ড ও অর্থ প্রদানকারী। মেহেদীর সংগ্রহে থাকা এই চার অংশের সদস্যদের সংগঠনের প্রতি আনুগত্য পরীক্ষা করার জন্য শপথ (বাইয়্যাত) পড়িয়ে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। এরই মধ্যে ঢাকা, টাঙ্গাইল, রাজশাহীসহ বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলায় উদ্বুদ্ধ সদস্যদের শপথ করান তিনি। ওই শপথের ভিডিও চিত্র বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে উগ্রবাদী চ্যানেলে প্রচারের মাধ্যমে সহযোগীদের উদ্বুদ্ধ করতেন মেহেদী।

জঙ্গি মেহেদীর ল্যাপটপে পাওয়া তথ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে এক র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, মেহেদীর নেতৃত্বে থাকা ব্রিগেড আদ-দার-ই-কুতনী অপারেশনাল সক্ষমতা অর্জন করেছে। তারা যেকোনো স্থানে নাশকতা চালাতে সক্ষম।

ওই কর্মকর্তা জানান, মূলত নব্য জেএমবির (সারোয়ার-তামিম গ্রুপ) দুটি অপারেশনাল ব্রিগেডের সামরিক কার্যক্রম রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ‘বদর স্কোয়াড’। এই ব্রিগেড হলি আর্টিজানসহ অন্যান্য হামলায় সক্রিয় ভূমিকা রাখে। আর দ্বিতীয় ব্রিগেড আদ-দার-ই-কুতনী। এরা ব্যাকআপ বা রিজার্ভ ব্রিগেড হিসেবে মাঠপর্যায়ে সক্রিয়। ব্রিগেড আদ-দার-ই-কুতনী তথ্য-প্রযুক্তিতে দক্ষ। জঙ্গিবিরোধী অভিযানে মূল অপারেশনাল ব্রিগেড ‘বদর স্কোয়াড’-এর বেশির ভাগ সদস্য নিহত ও আটক হওয়ায় ‘আদ-দার-ই-কুতনী’ দুর্বল হওয়া বদর স্কোয়াডকে শক্তিশালী করতে কার্যক্রম শুরু করে। গত বছর অক্টোবরে র‌্যাবের অভিযানের মধ্যে পালাতে গিয়ে নিহত হন নব্য জেএমবির তখনকার আমির সারোয়ার জাহান ওরফে আবু ইব্রাহিম আল হানিফ। এর আগে সারোয়ারের বাসায় পাওয়া আলামত থেকে এ সংগঠনের দুটি সামরিক ব্রিগেড থাকার তথ্য পাওয়া যায়।

মেহেদীকে গত বুধবার রাতে রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রীর একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তাঁর কাছ থেকে দুটি ল্যাপটপ, একটি মোবাইল ফোনসেট, একটি পাসপোর্ট, উগ্রবাদী বইসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে বলে র‌্যাব জানায়। গ্রেপ্তারের পর চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

তবে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছে, গত ৪ মে থেকে মেহেদী নিখোঁজ ছিলেন। তাঁর সন্ধান পেতে খিলগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। মেহেদীর বাবা খোরশেদ আলম পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ছিলেন। ১৯৯৯ সালে তিনি অবসরে যান। মেহেদীদের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার রাজাপুর গ্রামে। তিনি ঢাকার দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ সম্পন্ন করেছেন। শখ থেকেই তিনি মডেলিংয়ে সম্পৃক্ত হন। পাশাপাশি ব্যবসাও করতেন।


মন্তব্য