kalerkantho


জঙ্গিবাদে অর্থদাতা ১৭ সংস্থার তথ্য যায়নি এনজিও ব্যুরোতে

আরিফুজ্জামান তুহিন   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



জঙ্গি সংগঠনগুলোর অর্থ জোগানদাতা হিসেবে চিহ্নিত ১৭টি এনজিওর তালিকা করা হয়েছে বলে গত জুন মাসে জানিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ওই সব এনজিওর কার্যক্রম খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছিল।

কিন্তু তিন মাসেও ওই তালিকা পৌঁছায়নি এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর কাছে। এনজিও ব্যুরোর দাবি, তাদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে ওই সব বিদেশি এনজিও বাস্তবে কী করছে তা খতিয়ে দেখতে পারছে না প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে থাকা এনজিও ব্যুরো।

জানা গেছে, জঙ্গি কার্যক্রমে অর্থদাতা হিসেবে চিহ্নিত ওই এনজিওগুলোর একটি হলো জাকাত ফাউন্ডেশন। এর বিরুদ্ধে অভিযোগ, কোনো জঙ্গি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে নিহত হলে বা ধরা পড়লে তার পরিবারকে সহায়তা করে থাকে এনজিওটি। ফলে জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিয়ে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তার পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে না। জাকাত ফাউন্ডেশনের মূল কাজ বিদেশ থেকে জাকাত সংগ্রহ করে বাংলাদেশে তা দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করা। পাশাপাশি ঢাকায় তাদের একটি এতিমখানা ও একটি হাসপাতাল রয়েছে। ওই হাসপাতালে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় বলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও আশপাশের লোকজনের মতে, বাস্তবে এর কার্যক্রম রহস্যজনক।

জানা গেছে, গত ২১ জুন আইন-শৃঙ্খলাবিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জঙ্গি সংগঠনকে অর্থ দেয় এমন ১৭টি বিদেশি এনজিওকে শনাক্ত করা হয়। শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান উপস্থিত ছিলেন।

ওই তালিকার বিষয়ে জানতে চাইলে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর পরিচালক মো. শাহাদত হোসেন গত মঙ্গলবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি আমরা শুনেছি। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো তালিকা বা চিঠি পাইনি। ফলে অভিযুক্ত এনজিওগুলো কারা তা আমরা জানতে পারিনি। সে জন্য তাদের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি রাখাও সম্ভব হচ্ছে না। ’ তিনি আরো বলেন, ‘১৭টি এনজিওর তালিকা চেয়ে আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। সেই চিঠির জবাব এখনো এসে পৌঁছেনি। ’

জঙ্গি সংগঠনগুলোকে অর্থায়ন করে এমন এনজিওর ওপর নজরদারি করে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক। জঙ্গিবাদে অর্থায়নে যুক্ত থাকা ১৭টি বিদেশি এনজিওকে চিহ্নিত করে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। ওই এনজিওগুলোর মধ্যে রয়েছে মুসলিম এইড বাংলাদেশ, রাবেতা আল-আলম ইসলামী, কাতার চ্যারিটেবল সোসাইটি, ইসলামিক রিলিফ এজেন্সি, আল-ফুরকান ফাউন্ডেশন, কুয়েত জয়েন্ট রিলিফ কমিটি, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক রিলিফ সংস্থা, হায়তুল ইগাছা, রিভাইভাল অব ইসলামিক হেরিটেজ সোসাইটি, তাওহিদী নুর, আলমুনতাদা আল ইসলামী।

অভিযুক্ত ১৭টি বিদেশি এনজিওর মধ্যে রিভাইভাল অব ইসলামিক হেরিটেজ সোসাইটির নিবন্ধন ২০০৭ সালের ৬ মে বাতিল করে বাংলাদেশে এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া বাকি এনজিওগুলো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

অভিযুক্ত ১৭টি এনজিওর মধ্যে রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামীর বিরুদ্ধে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশকে (জেএমবি) আর্থিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী বিশ্বব্যাপী মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ নামে পরিচিত। বাংলাদেশে এর সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক রিলিফ অর্গানাইজেশনের (আইআইআরও) নামও রয়েছে অভিযুক্ত ১৭ এনজিওর তালিকায়। মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগের পাকিস্তান শাখার প্রধান ছিলেন আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনের বোনজামাই মোহাম্মদ জামাল খলিফা। মাদাগাস্কারের সরকারি বাহিনীর অভিযানে ২০০৭ সালে তিনি নিহত হন।

পাকিস্তানের নাগরিক ইউসুফ ইসলামের গড়া মুসলিম এইড বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানিতে কাজ করে। বাংলাদেশে একসময় মুসলিম এইডের চেয়ারম্যান ছিলেন জামায়াত নেতা মাওলানা আবদুস সুবহান। এনজিওটির বিরুদ্ধে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা, হিজবুল মোজাহিদীন ও জইশ-ই-মোহাম্মদের সম্পর্ক থাকার অভিযোগ রয়েছে।

জাকাত ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম নিয়ে কর্মকর্তাদের তথ্যেই গরমিল : সম্প্রতি জাকাত ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয় রাজধানীর ঝিগাতলার ৭/১ মনেশ্বর রোডে গেলে সেখানকার কর্তব্যরত প্রহরী এই প্রতিবেদককে ঢুকতে দেননি। এরপর ওই কার্যালয়ে ফোন করলে সেখানকার নির্বাহী কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে মো. মাসুদ নামের একজন জানান, ঝিগাতলার গাবতলা মসজিদেই একটি এতিমখানা পরিচালনা করেন তাঁরা। ওই সময় জাকাত ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর নাহিদা সুলতানার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে পরে যোগাযোগ করা হবে বলে জানানো হয়। তবে এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত জাকাত ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে কেউ যোগাযোগ করেনি। ফাউন্ডেশনের মাসুদের দেওয়া ঠিকানা ধরে ছয়তলা ভবনে গাবতলা মসজিদে গিয়ে এতিমখানার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে মসজিদের সামনের গলির প্রহরী মোহাম্মদ আলী নিশ্চিত করে জানান, এ মসজিদে কোনো এতিমখানা নেই। এমন কি মসজিদের আশপাশেও কোনো এতিমখানা নেই।

জাকাত ফাউন্ডেশন পরিচালিত একটি হাসপাতালে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় বলে এর কর্মকর্তারা দাবি করেন। তবে তাঁদের দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায়, এটি রায়েরবাজার বেড়িবাঁধের পশ্চিমদিকে ১০০/১ নম্বরে একটি সরু গলির মধ্যে। হাসপাতাল বলতে বাস্তবে সেখানে কিছু নেই। একটি দোতলা পুরনো বাড়িতে একটি মাদরাসা রয়েছে। সেটির দোতলায় প্রতি বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারে হাসপাতালের নামে যে কাজ পরিচালনা করা হয়ে থাকে তাও রহস্যজনক বলে জানিয়েছেন এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা। তাঁরা আরো জানান, ওই মাদরাসায় এলাকার বস্তির মাত্র একটি পরিবারের সন্তানরা যায়, বাকিরা কোথা থেকে আসে কেউ জানে না। মাদরাসা ও কথিত ফ্রি হাসপাতালের সামনের মুদি দোকানদার রনি বলেন, হাসপাতালে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারে যেসব ডাক্তার দেখতে আসেন তাঁরাই আবার মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। সম্প্রতি এইচ এম আজিমউদ্দিনকে মাদরাসার স্থায়ী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তিনি ছাড়া স্থায়ী কোনো শিক্ষক মাদরাসাটিতে নেই।

জানা গেছে, জাকাত ফাউন্ডেশন বিভিন্ন সময় সাতক্ষীরা, পাবনা, দিনাজপুরসহ কয়েকটি অঞ্চলে দরিদ্রদের গরু ও নগদ অর্থ দিয়েছে। তবে এসব সহায়তা এমন পরিবার ও ব্যক্তিদের দেওয়া হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত থাকার বা মদদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।


মন্তব্য