kalerkantho


বন্যায় ক্ষতির পর রংপুর অঞ্চলে ‘মঙ্গার ধান’

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বন্যায় ক্ষতির পর রংপুর অঞ্চলে ‘মঙ্গার ধান’

বন্যায় রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় সদ্য রোপণকৃত রোপা আমন ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে আশার কথা তিস্তার চরসহ এই অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি ও আগাম জাতের আমন ধানে শিষ বের হতে শুরু করেছে।

কোথাও কোথাও ১০০ দিন সময়কালের জিংকসমৃদ্ধ ব্রিধান-৬২সহ আগাম ধান পেকেছে, যা কৃষকের ঘরে উঠতে শুরু করেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি রোপা আমন মৌসুমে এ অঞ্চলের পাঁচ জেলায় পাঁচ লাখ ৪০ হাজার ৭২৮ হেক্টর জমিতে চারা লাগানো হয়। কিন্তু অবিরাম বর্ষণসহ সাম্প্রতিক বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় এক লাখ ৭৪ হাজার ১৫ হেক্টর জমির ধান ক্ষেত। এর মধ্যে রয়েছে রংপুরে ৩৮ হাজার ২০০ হেক্টর, গাইবান্ধায় ২০ হাজার ৭৫০ হেক্টর, কুড়িগ্রামে ৪৬ হাজার ১৪০ হেক্টর, লালমনিরহাটে ৩১ হাজার ১৩৫ হেক্টর এবং নীলফামারীতে ৩৭ হাজার ৭৯০ হেক্টর। সরকারিভাবে এখনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব না মিললেও বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী এতে কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা।

অন্যদিকে মৌসুমের শেষ সময়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমিতে রোপণকৃত আমন ক্ষেতগুলো সজিবতা ফিরে পেয়েছে। আগাম রবি ফসল চাষের লক্ষ্য নিয়ে কৃষকরা এমন জমিতে প্রতিবছর স্বল্পমেয়াদি ও আগাম জাতের ধান চাষ করে থাকেন। অন্যান্য বছর এসব জমিতে বাড়তি সেচের প্রয়োজন হলেও এবারে ভারি বর্ষণে সেচ ছাড়াই আশানুরূপ ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষি বিভাগ জানায়, রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় স্বল্পমেয়াদি ও আগাম জাতের ধানের মধ্যে রয়েছে ব্রিধান-৩৩, ব্রিধান-৩৯, ব্রিধান-৪৫, ব্রিধান-৬২ ও বিনা-৭।

প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে এই ধান চাষ করা হয়েছে। এ ছাড়া হাইব্রিড জাতও রয়েছে। এসব আগাম ধানের ক্ষেতে এখন শিষ বের হতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও ধান পাকছে, যা সপ্তাহখানেকের মধ্যে কর্তন করা যাবে বলেও সূত্র জানায়।

সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সবুজ আমন ক্ষেতের মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে স্বল্পমেয়াদি ও আগাম জাতের সদ্য বের হওয়া ধানের শিষ। কয়েক বছর ধরে ব্রি-৩৩ ও বিনা-৭ জাতের আগাম ধানের চাষ করেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টা ইউনিয়নের হাবু গ্রামের কৃষক তৈয়ব আলী। তিনি জানান, প্রচলিত ধানের এক থেকে দেড় মাস আগে এ ধান কাটা যায়। এ অঞ্চলে আশ্বিন-কার্তিক মাসের অভাবের সময় এই ধান পাওয়া যায় বলে এলাকার মানুষ আগাম এ জাতের ধানকে ‘মঙ্গার ধান’ বলে থাকে।

নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার মাগুড়া, রনচণ্ডি, গাড়াগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় চাষকৃত স্বল্পমেয়াদি ও আগাম জাতের আমন ধানে ব্যাপক শিষ বের হয়েছে। ধান পাকতে শুরু করেছে কোনো কোনো ক্ষেতে।

মাগুরা গ্রামের কৃষক আকমল হোসেন দেড় বিঘা জমিতে আগাম ব্রি-৫৭ জাতের ধান চাষ করেছেন। ধানে শিষ বের হয়েছে। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার রুদ্রেশ্বর এলাকার কৃষক আবু হোসেন বলেন, ‘হামার ধানোত পাক ধরচে বাহে...। আর কয়দিন পরে কাটা যাইবে। আশ্বিন-কার্তিকের মঙ্গা ঠেকা (মোকাবেলা) নাগবেতো!’ আগাম বিনা-৭ জাতের আমন ধানে সোনালি রং ধারণ করায় খুশিতে এমন অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।

ওই এলাকায় কর্মরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রুহুল ইসলাম সরকার জানান, জিংকসমৃদ্ধ হওয়ায় ব্রিধান-৬২ জাতের ধানের চালে পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। তা ছাড়া এর জীবনকাল (বীজ বপনসহ ধান কাটা পর্যন্ত) ১০০ দিন হওয়ায় সবার আগে এই ধান কর্তন করা যায়।

কৃষকরা জানান, স্বল্পমেয়াদি ও আগাম জাতের ধান চাষের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে যেমন অভাবের সময় ঘরে ফসল ওঠে তেমনি কৃষি শ্রমিকদেরও কর্মসংস্থান হয়। ধান কাটার পর ওই জমিতে আলুসহ পরবর্তী রবি ফসলও আগাম চাষ করা যায় বলে জানান তাঁরা।

রংপুর অঞ্চলে মৌসুমের শেষ সময়ে কৃষক পরিবারে শুরু হয় টানাপড়েন। প্রতিবছর আশ্বিন-কার্তিক মাসে এখানকার কৃষি শ্রমিকদের হাতে কোনো কাজ থাকে না। তবে উদ্ভাবিত আগাম আমন ধান চাষ পদ্ধতি মঙ্গা নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে।


মন্তব্য