kalerkantho


রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা

সীমান্তে নৈরাজ্য, পাঁচ দিনে ১৮৫০০ রোহিঙ্গার আশ্রয়

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার ও জাবেদ ইকবাল চৌধুরী, টেকনাফ   

৩১ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ নিয়ে প্রথম দিকে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা যাচ্ছে না। সীমান্ত দিয়ে দলে দলে রোহিঙ্গা ঢুকে পড়ছে বাংলাদেশে। থামানো যাচ্ছে না রোহিঙ্গা স্রোত। উদ্বেগজনক অনুপ্রবেশে এলাকাবাসীও বুঝতে পারছে না রোহিঙ্গা নিয়ে কী হতে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এমনই যে অনুপ্রবেশকালে বিজিবি যতসংখ্যক রোহিঙ্গাকে ধরে পুশব্যাক করে দেয়, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোহিঙ্গা পুনরায় ঢুকে পড়ছে। সীমান্তের কোনো কোনো পয়েন্টে দিনে না পারলে রাতে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটে। আবার কোনো পয়েন্টে রাত-দিনই বিনা বাধায় সমানে অনুপ্রবেশ ঘটছে।

এই পরিস্থিতিতে গতকাল বুধবার কক্সবাজারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, গত পাঁচ দিনে অন্তত ১৮ হাজার রোহিঙ্গা

বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। অন্যদিকে আইওএমের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় মুখপাত্র ক্রিস লোম বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, রাখাইন রাজ্যে শুক্রবার রাতে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর থেকে গতকাল পর্যন্ত সাড়ে ১৮ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

আইওএমের সংবাদ সম্মেলন : সংবাদ সম্মেলনে আইওএম বলেছে, তাদের ধারণা অন্তত ১৮ হাজার রোহিঙ্গা স্থলভাগ ও নদী-সমুদ্রপথ পেরিয়ে কক্সবাজারের উপকূলবর্তী বিভিন্ন গ্রাম ও শরণার্থী শিবিরে প্রবেশ করেছে। গত ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরুর পর থেকে এই পরিস্থিতি চলছে। জাতিসংঘের এই সংস্থাটির মতে, আরো শত শত রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে, মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডে। অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় ‘পাইপ লাইনে’ থাকা এসব রোহিঙ্গাও সীমান্তে বিজিবি টহলদলকে ফাঁকি দেওয়াসহ সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।

আইওএম কক্সবাজার প্রধান সংযুক্তা শাহানি বলেন, ‘আমাদের ধারণা, গত এক সপ্তাহে ১৮ হাজার (রোহিঙ্গা) এসেছে। এটা বৈজ্ঞানিক তথ্যনির্ভর নয়। কারণ আমরা কোনো জরিপ বা শুনানি করতে পারিনি। তবু মোটামুটি দেখেছি ১৮ হাজারের মতো চলে এসেছে। তারা লেদা, কুতুবপালং, বালুখালির গ্রামগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। শরণার্থী ক্যাম্পে তারা আসছে, যাচ্ছে।’

আইওএমের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে অনেকে আছে, কিন্তু সীমান্তে তাদের বাধা দিচ্ছে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এক সপ্তাহে শত শত রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। পালিয়ে আসা নারী-পুরুষদের অনেকেই সীমান্ত এলাকায় বসে আছে। নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে অসহায় জীবন যাপন করছে তারা।’ তিনি আরো বলেন, ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে অনেকে আছে, কিন্তু সেখানে গিয়ে গণনা করার কোনো সুবিধা নেই। ফলে গণনা ছাড়া প্রকৃত সংখ্যা কেউ বলতে পারবে না। তবে শত শত মানুষ সেখানে খোলা আকাশের নিচে আছে। আমরা চেষ্টা করছি, তাদের সহায়তা করতে। কারণ জীবন রক্ষা করা প্রথম দাবি। জীবন বাঁচাতে যে সহায়তা দরকার, আমরা সেটাই দেব। কতজন আসছে, কারা আসছে, তাদের নিয়ে কী করা হবে, সেটা পরের ব্যাপার। এ মুহূর্তে আমরা তাদের জীবন রক্ষার সহায়তা দিচ্ছি।’

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ নিয়ে নৈরাজ্য, দালাল আটক : রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকে কেন্দ্র করে পুরো সীমান্তে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। রাখাইন রাজ্য থেকে দলে দলে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঘটানোর জন্য পুরো সীমান্ত এলাকায় গিজ গিজ করছে দালালের দল। নাফ নদের এপার থেকে নৌকা নিয়ে ওপারে যায় রোহিঙ্গাদের আনার জন্য। রাখাইন রাজ্যের এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে এপার থেকে নৌকা নিয়ে রোহিঙ্গা আনার জন্য নাফ নদীর ওপারে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে পড়েছে স্থানীয় দুই বাসিন্দা। মঙ্গলবার টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুরা এলাকার ওপারে ঘটেছে এ ঘটনা। এপারের বাসিন্দা রশিদ আহমদ ও ইব্রাহিমের সন্ধান গতকাল বুধবার বিকেল পর্যন্ত মেলেনি। সন্দেহ করা হচ্ছে, তারা মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী-বিজিপির গুলিতে মারা গেছে।


মন্তব্য