kalerkantho


কুড়িগ্রামে বানভাসিদের ঈদ

‘হামার সউগ ভাসি গেইছে আনন্দ করি কী দিয়া?’

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি   

৩১ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



‘হামার সউগ ভাসি গেইছে আনন্দ করি কী দিয়া?’

এখনো তাঁরা বন্যা রক্ষা বাঁধে। বানভাসিদের কাছে ঈদ যেন শুধুই একটি দিন। ছবি : কালের কণ্ঠ

রুগ্ণ শরীরে দিনমজুরির ধকল সয় না। কেউ কাজেও নিতে চায় না। ছেলের সংসারেই দিন কাটছিল বৃদ্ধ জয়নালের। বাঁধের ওপর কোনোমতে মাথা গুঁজে পড়ে ছিলেন। কিন্তু সেই সুখটুকুও কপালে সয়নি। বানের পানিতে ঘরসহ সব ভেসে গেছে। কোনো কিছু বাঁচাতে পারেননি বন্যার তাণ্ডব থেকে। বাড়ির ভেতরে আট ফুট গর্ত। এখন আশ্রয় নিয়েছেন বাড়ি থেকে ৩০০ ফুট দূরে সেই বাঁধের রাস্তাতেই, ছাপড়া ঘরে। দিনমজুর ছেলের হাতে কাজ নেই। জীবন চলছে রিলিফে ভর করে। এ অবস্থায় ঈদের প্রসঙ্গ তুলতেই বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাস পড়ল—‘হামার সউগ ভাসি গেইছে। পকেটোত চাইর পইসা নাই। হামরা ফির ঈদের আনন্দ করি কী দিয়া?’

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় সারোডোব বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর জয়নালের পরিবারের মতো আশ্রয় নিয়েছে আরো ৪০টির মতো বন্যাদুর্গত পরিবার। কেউ পলিথিন, কেউ ত্রিপল, কেউ বা অনেক চেষ্টায় বাঁচানো দু-চারটি টিন দিয়ে ছাপড়া তুলে আছে। অপরিচিত লোক দেখলেই ছুটে যায় ত্রাণের আশায়। অনুনয়-বিনয় করে একটি স্লিপের জন্য। গতকাল বুধবার ধরলা নদীর পারে বন্যাবিধস্ত গ্রাম চর সারোডোব গিয়ে এ চিত্র দেখা যায়।

গ্রামটির সর্বত্র বন্যার ধবংসযজ্ঞের চিহ্ন স্পষ্ট। গাছপালা, ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে আছে। ফসল তো গেছেই, আবাদি জমি চার থেকে আট ফুট বালুতে ঢেকে আছে। ছোট-মাঝারি কৃষক পরিবারে চলছে হাহাকার। দিনমজুররা সম্পূর্ণ বেকার। হাতে কাজ নেই। চড়া সুদে দাদন নিয়ে কেউ কেউ দিন গুজরান করছে। বাস্তুভিটা ভেঙে যাওয়ায় এবং জমি বালুতে ঢেকে যাওয়ায় এখান থেকে বসতের পাট চুকাতে হচ্ছে অনেককেই। নুর হোসেন, এরশাদ, শাহ আলম আর নুরুন্নবীর মতো অনেকেই চলে যাচ্ছেন এই মরা গ্রাম ছেড়ে দূর কোনো গ্রামে। ঈদের কোনো আমেজ নেই ধরলা পারের এই গ্রামে। দাদন ও ত্রাণনির্ভর জীবনে আনন্দের কোনো উপলক্ষ হতে পারেনি ঈদ। পানিতে ভেসে গেছে কাপড়। ভেসে গেছে ধান, চাল, ঘরের আসবাব। ঈদের জামাত আদায় করতে হবে অনেককেই ছেঁড়া জামা গায়ে দিয়ে। মোকছেন, মজিবর, মুকরুদ্দির মতো হাতে গোনা কয়েকজন কৃষক অন্যান্য বছর কোরবানি দিলেও এবার কারো সামর্থ্য নেই।

দিনমজুর নুরুল হকের দুটি ঘর ভেসে গেছে। ঢলের তাণ্ডব থেকে ঝুঁকি নিয়ে মাত্র সাতটি টিন রক্ষা করতে পেরেছেন তিনি। গত বছর বেসরকারি সংস্থা কেয়ার থেকে পাওয়া ত্রিপল টাঙিয়ে আছেন স্ত্রী নূরজাহানসহ। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা থেকে কিছু চাল, চিঁড়া ও আলু পেয়েছেন। তাও শেষের দিকে। দিনমজুর শাহ আলম জানান, এলাকায় কাজ নেই। কাজের খোঁজে নদী পার হয়ে কাঁঠালবাড়ী গেলে পারাপারের খরচ ৩০ টাকা লাগে। তাও কাজ পাওয়া যায় না। রুমি বেগমের বাড়ির আঙিনায় এখন আট ফুট গর্ত। দুটি ঘর বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে আছে। স্বামীর হাতে কাজ নেই। রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ। রুমি বলেন, ‘হামরা ইলিপ (রিলিফ) চাই না। রাস্তা ঠিক করি দেন। করি খাবার পামো।’ বৃদ্ধ শাহারত আলীর স্ত্রী বেঁচে নেই। ছেলে-বউদের অনুগ্রহে চলেন। ছেলেদের হাতে কাজ না থাকায় খুব কষ্টে আছেন। বলেন, ‘হামার দুঃখের শ্যাষ নাই। নেসকাটার মতো থাকি। দুইটা দিলে খাই, না দিলে উপ্যাস।’ দিনমজুর জোসনা বেগম বলেন, ‘গেলবার ঈদোত বয়লার কিনি ছওয়াগুলাক খোওয়াইচি। এবার কপালোত তাও নাই।’ ভিক্ষুক মেহেরন বালুর নিচ থেকে কয়েকটি ভাঙা টিনের অংশ তুলে এনে বাঁধের অস্থায়ী ডেরায় ফেলছিলেন। বলেন, ‘বাবা, কাইয়ো ভিক্ষা দেয় না। ইলিপের একনা স্লিপ দিলে ভালো হইল হয়। মোরও নামটা নেকি নেও বাবা।’

সারোডোবের বিধবা জামেলা বেগম ৩৫ শতক জমিতে পাট ও ৫০ শতক জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। সব বালুতে ঢেকে গেছে। একই অবস্থা নুর ইসলাম, মোকলেছ, শহরত ও যাদু মিয়াসহ অনেক কৃষকের। কলা ও ধানক্ষেত হারিয়ে অনেকেই পথে পথে ঘুরছে। স্থানীয় সাবেক মেম্বার আশরাফ হোসেন জানান, গত ১০ বছরে এই চরে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মরিচ, ভুট্টা, ধানসহ অনেক ফসল আবাদ করে আর্থিকভাবে অনেকেই লাভবান হওয়ায় অভাব ঘুচতে শুরু করেছিল চরের। কিন্তু এবারের বন্যায় সব জমিই বালুতে ঢেকে গেছে। তাই কৃষকদের অনেকেই চর ছেড়ে চলে যাচ্ছে।



মন্তব্য