kalerkantho


মরছে ধলেশ্বরী, ক্ষুব্ধ পরিবেশ অধিদপ্তর

আরিফুর রহমান, সাভার থেকে ফিরে   

২২ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



মরছে ধলেশ্বরী, ক্ষুব্ধ পরিবেশ অধিদপ্তর

রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্প সাভারে সরিয়ে নিতে পরিবেশবাদীদের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, আদালতের নির্দেশ এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ—সব কিছুই যেন বিফলে যেতে বসেছে। বুড়িগঙ্গা রক্ষা ও হাজারীবাগ এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে গত এপ্রিলে কারখানার গ্যাস-বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পর চামড়া শিল্প সাভারে গেছে ঠিকই; কিন্তু সেখানেও শুরু হয়েছে ভয়াবহ পরিবেশদূষণ। এতে মরতে বসেছে ধলেশ্বরী নদী। তরল ও কঠিন বর্জ্যের পাশাপাশি পচা চামড়ার দুর্গন্ধে এলাকার মানুষের বসবাস অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শ্রমিকরাও ভুগছে নানা ধরনের রোগব্যাধিতে। বগুড়ার ধুনট থেকে আসা বিশ্বজিতের সংসার চলত ধলেশ্বরীতে মাছ ধরে। অথচ ভরা বর্ষায়ও জালে মাছ পড়ছে না।

প্রায় ১৯৯ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত সাভার শিল্পনগরীতে পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে এ বর্ষা মৌসুমে শিল্পনগরীর ভেতর হাঁটুসমান পানি জমে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। কারখানার বর্জ্য শিল্পনগরীর ভেতরই থাকছে। পুরো এলাকার রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা। ছোট ছোট অটোরিকশা দিয়ে বিশাল এলাকায় যাতায়াত তো দূরের কথা, হেঁটে চলাও কঠিন। সম্প্রতি সাভারের হরিণধরায় চামড়া শিল্পনগরী ঘুরে এসব চিত্র চোখে পড়েছে।

দফায় দফায় সময় বাড়ানো হলেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) নির্মাণকাজ শেষ করতে পারেনি চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ফলে ট্যানারির ময়লা পানি চলে যাচ্ছে ধলেশ্বরীতে। ওই নদীতে প্রতিদিন কারখানার শ্রমিকদের পাশাপাশি এলাকার মানুষও গোসল করছে। সিইটিপির ঠিক উল্টো দিকে একটি কুয়ার মধ্যে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। খোলা জায়গায় এভাবে বর্জ্য স্তূপ করে রাখায় পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বর্ষায় কুয়ার মধ্যে থাকা বর্জ্য আর পানি একাকার হয়ে পরিবেশের মারাত্মক দূষণ ঘটাচ্ছে। শিল্পনগরী এলাকায় চামড়ায় ব্যবহার করা লবণ পরিশোধনের ব্যবস্থা নেই। ফলে পরিশোধন ছাড়াই লবণাক্ত পানি পড়ছে ধলেশ্বরীতে। এতে মাছ মরে যাচ্ছে।

সাভারে এমন পরিবেশদূষণের বিষয়টি নজরে এসেছে আদালতেরও। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেন সিইটিপির নির্মাণকাজ শেষ হয়নি, তা জানতে আগামী ২২ আগস্ট আদালতে তলব করা হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তিনজনকে।

ধলেশ্বরীর দূষণরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ১০ বারেরও বেশি চিঠি দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন বিসিককে। কিন্তু সংস্থাটি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তর ধলেশ্বরীর পানি এবং সিইটিপি থেকে বের হওয়া বর্জ্য পরীক্ষা করে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর উপাদানের প্রমাণ পেয়েছে। সাভারের চামড়া শিল্পনগরী এবং এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য গত শনিবার বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) একটি প্রতিনিধিদল পুরো শিল্প এলাকা পরিদর্শন করে। পরে বাপার সহসভাপতি সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ধলেশ্বরী নদী কোনোভাবেই ট্যানারির দূষণমুক্ত হচ্ছে না। কাজেই বুড়িগঙ্গার পার থেকে ট্যানারি সরানোর উদ্দেশ্য কার্যত ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে।

সাভার চামড়া শিল্পের পরিবেশদূষণ নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইছউল আলম মণ্ডল গত সপ্তাহে পরিবেশ ও বন সচিব ইসতিয়াক আহমদকে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, নির্মাণকারী চীনা সংস্থার খামখেয়ালিপনা এবং তদারকি সংস্থা বিসিকের সক্ষমতার অভাবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও সিইটিপি কার্যকরভাবে ট্যানারিগুলোর তরলবর্জ্য পরিশোধনে ব্যর্থ হচ্ছে। যার কারণে জীববৈচিত্র্যে ভরপুর ধলেশ্বরী নদীদূষণ ও অবহেলার শিকার হয়ে এর স্বাস্থ্য ক্রমাগত সঙ্গিন হয়ে পড়ছে। নদীর জলজ জীব ও ক্ষুদ্র অণুজীব নিঃশেষ হতে চলেছে।’

বাপার সাধারণ সম্পাদক ডা. আবদুল মতিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ট্যানারি স্থানান্তর নয়, স্থানান্তরিত হয়েছে দূষণ। আগে দূষিত হতো বুড়িগঙ্গা, এখন হচ্ছে ধলেশ্বরী। তাহলে চামড়া শিল্পনগরী সরিয়ে লাভ কী হলো।’

সরেজমিন হেমায়েতপুরের বাঘবাড়ী মোড় থেকে হরিণধরার দিকে যেতেই নাকে আসে চামড়া পচার দুর্গন্ধ। প্রকল্প এলাকায় দুটি মডিউল দিয়ে চলছে বর্জ্য পরিশোধন।

পবার চেয়ারম্যান আবু নাসের খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে লাভটা কী হলো? সাভারে আরেকটা হাজারীবাগ হোক, আমরা চাই না।’



মন্তব্য