kalerkantho


আদুরি নির্যাতনের মামলার রায় আজ

ক্ষত মেলেনি ব্যথা সারেনি

এমরান হাসান সোহেল, পটুয়াখালী    

১৮ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



ক্ষত মেলেনি ব্যথা সারেনি

আদুরির মুখে এখনো নির্যাতনের ক্ষত। ছবি : কালের কণ্ঠ

গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে ঢাকায় নির্যাতনের শিকার শিশু আদুরি আজও ব্যথায় কাতরায়। পরিবার চলছে অনাহার-অর্ধাহারে।

আর এর মধ্যে আজ মঙ্গলবার আদুরিকে নির্যাতনের মামলার রায় ঘোষণা করার কথা রয়েছে। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩-এর বিচারক জয়শ্রী সমাদ্দার এ রায় ঘোষণা করবেন।

আদুরি পটুয়াখালীর মেয়ে। সরেজমিনে জানা গেছে, বর্তমানে পূর্ব জৈনকাঠি সালেহিয়া দাখিল মাদরাসার তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়ন করে সে। জমিজমা না থাকায় নির্যাতনের পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে আদুরির পরিবারকে ঘর তুলে বসবাসের জন্য গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালী সদর উপজেলার জৈনকাঠি এলাকায় চার কাঠা জমি কিনে দেওয়া হয়। ওই জমিতে দুই চালা ছোট টিনের ঘরে বড় ভাই সোহেল মৃধা আর মায়ের সঙ্গে থাকে সে। মাসহ তিন ভাই-বোন। পেশায় জেলে বড় ভাইর যা আয়, তা দিয়ে পুরো পরিবারের দিন পার করা বড়ই দায়। তাই মাঝেমধ্যে অর্ধহার-অনাহারে দিন যায় তাদের।

গ্রামের অন্য সব শিশুর মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছে না আদুরি। শরীরজুড়ে নির্যাতনের চিহ্নগুলো আজও স্পষ্ট।

আদুরির মা সাফিয়া বেগম কাপড়ের আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘জোবায় জোবায় (বিভিন্ন সময়) অয় (আদুরি) চিরাচিরি (চিৎকার করে) করে, তহন কয়, মাগো আমার শরীরের মধ্যে চুলকায় যন্তনা করে। রাইত হইলে ঘুমের মধ্যে চিহার দিয়া ওডে, আর কয় মাগো নদী (আদুরির অত্যাচারকারী) ওই আইছে। আমারে মারবে, মা আমারে ধরো। আমার ডর করে। মাগো আমারে বাঁচাও মা। বাইচ্চা থাকাইক্কাও মাইয়াডা আমার অসুস্থ। দস্যু গো বিচার চাই। নদী তো জেল খাইট্টা বাইরাইয়া যাইবে। কিন্তু আমার মাইয়াডা হারা জীবন অসুস্থই থাকপে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার মেয়ের শরীরে খুন্তি ও আগুনের ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্নগুলা ফুইল্লা রইছে। বোহে (বুকে) ইস্থারি (আয়রন) ছ্যাঁকের দাগ এহনও ভরাট অয় নাই। শরীলের দাগগুলা দেখলে ডর করে, মাথার দাগ যেহানে ওই সব জাগায় এহনও চুল ওঠে নাই। ’ এখন আর খুব বেশি কথা কয় না আদুরি। কেমন আছ? জানতে চাইলে ১৩ বছরের আদুরি বলে, ‘মাথার মধ্যে ব্যতা করে, শরীলের মধ্যে ব্যতাগুলা চুলকায়। আমারে যে নদী মারছে হ্যাগো তো টাহা আছে, হ্যারা তো জেল দিয়া বাইর হইয়া জাইবে। আমি এই ব্যতা সহ্য করতে পারি না। ’ এসব কথা বলতে বলতে আদুরি কান্নায় ভেঙে পড়ে।

পরিবার জানায়, অভাবের সংসারে মৃত আব্দুল খালেক মৃধার মেয়ে আদুরিকে ১১ বছর বয়সে ঢাকায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজে পাঠান মা। তবে কাজে দেওয়ার পর থেকে গৃহকর্ত্রী নওরীন জাহান নদী বিভিন্ন অজুহাতে আদুরির ওপর নির্যাতন চালাতেন। ২০১৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নির্যাতনের একপর্যায়ে মৃত ভেবে আদুরিকে ডাস্টবিনের পাশ ফেলে রেখে চলে যায় নদীর পরিবারের লোকজন। ডাস্টবিনটি রাজধানীর বারিধারা ও ডিওএইচএস তেলের ডিপোর মাঝামাঝি রেললাইনসংলগ্ন। ওই দিন সন্ধ্যায় সেখান থেকে অচেতন অবস্থায় হাড্ডিসার ও মৃতপ্রায় আদুরিকে উদ্ধার করা হয়।

আদুরিকে নির্যাতনের ঘটনায় ২৬ সেপ্টেম্বর পল্লবী থানায় নওরীন জাহান নদী, তাঁর স্বামী সাইফুল ইসলাম মাসুদ, মাসুদের দুলাভাই চুন্নু মীর ও তাঁদের আত্মীয় রনিকে আসামি করে আদুরির মামা একটি মামলা করেন। তবে পুলিশি তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অভিযোগপত্র থেকে মাসুদ, চুন্নু মীর ও রনিকে বাদ দেওয়া হয়। তদন্তে নদীর মা ইসরাত জাহানের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় নতুন করে তাঁকে আসামি করা হয়।


মন্তব্য