kalerkantho


বেঙ্গল সংস্কৃতি উৎসব শেষ হচ্ছে আজ

বিদায়ের বেলায় বিষাদের সুর

সিলেট অফিস   

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বিদায়ের বেলায় বিষাদের সুর

সিলেটে বেঙ্গল সংস্কৃতি উৎসবের নবম দিনে শিশুদের পরিবেশনা। ছবি : আশকার আমিন রাব্বি

এত সুর, গান আর ঝলমলে আলোর মধ্যেও কোথায় যেন বিষাদের উপস্থিতি। সিলেটে ১০ দিনব্যাপী বেঙ্গল সংস্কৃতি উৎসবের নবম দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার উৎসবস্থল ঘুরে ও দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র দেখা গেছে।

নৃত্য, সংগীত, মঞ্চনাটক, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী—সব কিছুই চলছে প্রতিদিনের মতো। তার পরও দর্শকদের মুখে যেন খানিকটা বিষাদের ছায়া। বিশেষ করে যারা প্রতিদিন হাজির হয়েছে উৎসবে, তাদের বেলায় যেন এর তীব্রতা একটু বেশি।

উৎসবস্থলে কথা হয় সিলেট জেলা বারের তরুণ আইনজীবী রণেন সরকারের সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দিনের কাজ সেরে সন্ধ্যার পরই এই কয়েক দিন চলে এসেছি বেঙ্গলের উৎসবে। কিভাবে যে এতটা দিন চলে গেল টের পাইনি। এখন খারাপ লাগছে। আর তো মাত্র একটা দিন বাকি। ’ একই সুর লিটল বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের কর্মকর্তা প্রণব জ্যোতি পালের কণ্ঠে।

তিনি বললেন, ‘কাজ না থাকলে সাত-পাঁচ না ভেবেই উৎসবে চলে এসেছি এত দিন। উৎসব তো শেষের পথে। তাই একটু খারাপ লাগছে। ’

উৎসব শেষের দিকে হলেও দর্শকরা নিজেদের মতো করে তা উপভোগ করছে। যারাই উৎসবে আসছে কিছুটা সময় বাউলসম্রাট আবদুল করিম চত্বরে কাটাতে ভুল করছে না। মরমি সাধক ও বাউলদের জীবনকর্মের সঙ্গে দর্শনার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিতে এখানে ভিন্ন আয়োজন করেছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। শুধু মরমি সাধক, বাউল ফকির নন; প্রচলিত ও বিলুপ্তপ্রায় ৪০ ধরনের বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ মিলেছে এখানে। জানার সুযোগ হয়েছে বাদ্যযন্ত্রগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য। জেনে নেওয়া যাচ্ছে সিলেট অঞ্চলের লোকগানের ইতিহাস সম্পর্কেও। আবদুল করিম চত্বরে তাই সব বয়সীর আনাগোনা চোখে পড়েছে। প্রবীণরা এক ধরনের তৃপ্তি নিয়ে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নেন এই আয়োজনে। আর এ প্রজন্মের যারা তারা কৌতূহল আর বিস্ময় নিয়ে পরিচিত হয় নানা পদের বাদ্যযন্ত্র আর বাউল সাধকদের জীবনের সঙ্গে।

আবদুল করিম চত্বরে ঘুরতে আসা স্কুল শিক্ষক অনিমেষ দাস বললেন, ‘বেঙ্গল উৎসবের এই আয়োজনকে আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। আমাদের যে সমৃদ্ধ ও গর্বের ইতিহাস আছে তা এখানে এলে বোঝা যায়। বিশেষ করে তথ্য-প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে যাওয়া নতুন প্রজন্মের সামনে নান্দনিকভাবে এই ঐতিহ্য তুলে ধরার প্রয়াস প্রশংসার দাবি রাখে। ’

আবদুল করিম চত্বরে ঘুরলে দেখা মিলবে হারমোনিয়াম, অ্যাকর্ডিয়ান, ব্যাঞ্জোলিন বা ইন্ডিয়ান ব্যাঞ্জো বা বুলবুল তরঙ্গ, এসরাজ, বেহালা, সারঙ্গী, বাঁয়া তবলা, ফ্লুট, মোহন বাঁশি, মুরলী বাঁশি, আড়বাঁশি, তুবড়ি বা বীণ, বেণু, রোবানা, স্বরাজ, সুর সংগ্রহ, চিকরো, ট্রাম্পেট, স্বরনাই, কর্নেট বিউগল, সানাই, সারিন্দা, দোতারা, একতারা, গোপীযন্ত্র, ব্যানা আনন্দলহরি বা খমক বা গুবগুবি, তমুরা বা তানপুরা, স্বরমণ্ডল, সরোদ, পাখোয়াজ, করতাল, মন্দিরা, ঝাঁজ, করতাল কাঁসর বা কাঁসি, মেকুড়, খঞ্জনি, ডমরু বা ডুগডুগি, ঘুঙুর, প্রেমজুড়ি, হাত-বাঁয়া, চিত্তকটোলা, ঢাক (ডঙ্গা) ও সেতার। পাশেই উপস্থাপন করা হয়েছে বাদ্য যন্ত্রগুলোর ইতিহাস, উৎপত্তিসহ বিস্তারিত। সেখান থেকে জানা যায়, উনিশ শতকের প্রথমদিকে বার্লিনে অ্যাকর্ডিয়ান নামের বাদ্যযন্ত্রটি প্রথম প্রবর্তিত হয়। এরপর অভিবাসীদের হাত ধরে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে এটি ছড়িয়ে পড়ে এবং জনপ্রিয়তা পায়। উনিশ শতকের শুরু থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ইউরোপে অ্যাকর্ডিয়ানের স্বর্ণযুগ মনে করা হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার আয়োজনের নবম দিনে সৈয়দ মুজতবা আলী মঞ্চে প্রদর্শিত হয় চলচ্চিত্র ‘রীনা ব্রাউন’। সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় ছিল মঞ্চনাটক ‘কঞ্জুস’। এ ছাড়া হাছন রাজা মঞ্চে বিকেল ৪টায় ছোটদের পরিবেশনার মধ্যে দিয়ে হাছন রাজা মঞ্চ প্রাণ পায়। এ ছাড়া জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ সিলেট, শিশুতীর্থের পরিবেশনায় ছোটদের গীতিনাট্য, রাকিবা ইসলাম ঐশীর পরিবেশনায় নজরুলসংগীত, শফিউল আলম রাজার পরিবেশনায় ভাওয়াইয়া পরিবেশিত হয়। রাতে মঞ্চে ওঠেন দেশের খ্যাতিমান নজরুলসংগীত শিল্পী ফেরদৌস আরা। এরপর ওপার বাংলার শিল্পী হৈমন্তী শুক্লার আধুনিক গান শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। সবশেষে মঞ্চে আসেন লোকসংগীত শিল্পী পার্বতী বাউল। তাঁর পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শেষ হয় নবম দিনের আসর।


মন্তব্য