kalerkantho


খুলনায় এমএলএম কম্পানির ফাঁদে কিশোর-কিশোরী!

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



খুলনায় এমএলএম কম্পানির

ফাঁদে কিশোর-কিশোরী!

খুলনায় ‘ওয়ার্ল্ড মিশন ২১’ নামের একটি বহু স্তরভিত্তিক বিপণন (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) প্রতিষ্ঠান কিশোর-কিশোরী ও শিক্ষার্থী, বেকার-চাকরিজীবীসহ নানা শ্রেণির মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। চার হাজার ২৫০ টাকার বিনিময়ে লোকজনকে সদস্য করে মাসে লাখ লাখ টাকা রোজগারের লোভ দেখানো হচ্ছে।

লোভের ফাঁদে পড়ে বিপুলসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী ছুটছে এর পেছনে।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা শুধু টাকার লোভই দেখায় না, সেই সঙ্গে আছে দেশে ও বিদেশে ভ্রমণের লোভ; নেপাল, ভারত, ভুটান, থাইল্যান্ড, হংকং প্রভৃতি দেশে ভ্রমণের সুযোগ; কাজের সুবিধার্থে ১৫০ সিসি পালসার মোটরসাইকেল অথবা এক হাজার ৫০০ সিসির প্রাইভেট কার পাওয়ার সুযোগ; বসবাসের জন্য দেশের যেকোনো স্থানে পছন্দসই ফ্ল্যাট বাড়ি; আরো থাকছে কম্পানির শেয়ারহোল্ডার হওয়ার সুযোগ।

সদস্য হওয়ার পর একজন সদস্যকে প্রথমে দুজন, ওই দুজন চারজনকে, ওই চারজন আটজনকে—এভাবে কর্মী জোগাড় করতে হয়। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির খুলনায় বর্তমান সদস্যসংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। বিক্রয়কর্মীদের জন্য রয়েছে ছয়টি স্টার পাওয়ার সুযোগ। সদস্যসংখ্যা বাড়তে থাকলে স্টার সংখ্যা বাড়বে। একই সঙ্গে র্যাংক বাড়বে, টাকাও বাড়বে বলে জানানো হয়। তাই সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য চলে তীব্র প্রতিযোগিতা। পাতা হয় প্রেমের ফাঁদ, ফেসবুকে বন্ধুত্ব, ব্যক্তিগত পরিচিতি বৃদ্ধিসহ নানা কৌশল।

খুলনা মহানগরীর শিববাড়ী মোড়ের অদূরে এ-১২ নম্বর ভবনে (কোহিনূর টাওয়ার) এই কম্পানির অফিস। ভবনটির নিচতলায় শোরুম। এখানে নানা ইলেকট্রনিক সামগ্রী সাজানো রয়েছে। আর তৃতীয় তলায় অফিস তথা সম্মেলন কক্ষ। সম্প্রতি অফিসটির সম্মেলন কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, ডেস্কের ওপর সাজানো কম্পিউটার। পাঁচ-সাতজন বয়সী মানুষ এবং শতাধিক কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী সেখানে জড়ো হয়েছে। সেখানে তরুণদের বলা হচ্ছে, ‘টাকা দেওয়ার কথা বাড়িতে বলবে না। বাড়িতে বললে বাবা-মা টাকা দেবে না। তারা নানা কথা বলবে। উল্টো বলবে, লেখাপড়া বাদ দিয়ে তোমাকে ব্যবসা করতে হবে না। ’ নতুনদের আকৃষ্ট করার জন্য প্রথম সুযোগেই বেশ ভালো আচরণ করা হয়, ভালো আপ্যায়নও করা হয়।

ওয়ার্ল্ড মিশন ২১-এর কর্মী তাজিন আহমেদ তাজিনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সে ডুমুরিয়া উপজেলার শাহপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। তার স্কুলের শিক্ষক পলাশ কর্মকারের মাধ্যমে সে এদের সঙ্গে যুক্ত হয়। তাজিন জানায়, সে পাঁচ হাজার ৫০০ টাকার পণ্য কিনে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তিন মাস আগে যুক্ত হয়ে গত মাস পর্যন্ত আট হাজার টাকার মতো আয় করেছে। তাজিন এরই মধ্যে ২০ জনকে সদস্য করেছে। সে জানায়, অনেক চাকরিজীবীও বাড়তি আয়ের জন্য ওয়ার্ল্ড মিশনে যুক্ত হয়েছে।  

নগরীর বৈকালী এলাকার ম্যানগ্রোভ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী সুজন মুন্সী জানায়, মাসখানেক আগে এক বন্ধুর মাধ্যমে সে এখানে আসে। কর্মকর্তাদের কথা শুনে ভালো লাগে। তারা তাকে বেশ আপ্যায়ন করে। কলেজে টাকা লাগবে বলে সে বাড়ি থেকে চার হাজার টাকা নেয়। তা থেকে তিন হাজার ৭৫০ টাকা দিয়ে এখানকার সদস্য হয়েছে। সে এখনো কোনো টাকা আয় করতে পারেনি। দৌলতপুর বিএল কলেজের জীববিজ্ঞান সম্মান শ্রেণির প্রথম বর্ষের ছাত্র মো. জাকারিয়া হোসেন বলেন, তাঁর এক বান্ধবী আনিসার মাধ্যমে তিনি ওয়ার্ল্ড মিশনে এসেছেন।

কম্পানিটি সাধারণত ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, রান্নাঘরের প্রয়োজনীয় আসবাব, মোবাইল ফোনসেট প্রভৃতি বিক্রি করে। যদিও পণ্যের গায়ে ওয়ার্ল্ড মিশন ২১ নামের স্টিকার লাগানো আছে। তবে তারা মূল উৎপাদনকারী নয়।

কম্পানিটির কাজের ধরন নিয়ে কথা বলার জন্য তাদের ওয়েবসাইটে দেওয়া সেলফোনে (হটলাইন) রিং করলে একজন ওয়ার্ল্ড মিশন ২১-এর কর্মী বলে নিজেকে পরিচয় দেন। তবে নাম বলেননি। বলেন, সারা দেশে তাঁদের ব্যবসা আছে। আছে অফিস ও কর্মী। ব্যবসাটি বিদেশেও বিস্তৃত হবে। পণ্যগুলো তাঁদের নিজস্ব বলে তিনি দাবি করেন। প্রতিষ্ঠানের এমডির সঙ্গে কথা বলতে চাই জানালে তিনি বলেন, কী কারণে দেখা করবেন, এটি জানিয়ে অনুমতি পেলে তাঁর সঙ্গে উত্তরার অফিসে সরাসরি দেখা করতে পারবেন; অন্যথায় কথা বলা যাবে না। এমডির নামটিও তিনি বলেননি।

এভাবে বিক্রয়কর্মী সংগ্রহ করার বিষয়টি নিয়ে খুলনা জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, লোভ দেখিয়ে এভাবে কোমলমতি কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের বিক্রয়কর্মী হিসেবে তৈরি করা অপরাধ। এটি এক ধরনের প্রতারণা। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে জানান।

 


মন্তব্য