kalerkantho


এমপির ক্যাডার বুলির নতুন ‘কীর্তি’

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি   

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কলেজের অধ্যক্ষ। তবে কাজে নয় নামেই কলেজের অধ্যক্ষ।

কলেজে নিয়মিত না গিয়ে দলবাজি, মামলাবাজি, টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত থাকার অসংখ্য অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। ফলে কলেজে তাঁকে নিয়ে শুরু থেকেই রয়েছে নানা বিশৃঙ্খলা। দেশের বীর সন্তান মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষকে হটিয়ে সেই কলেজের অধ্যক্ষের পদটি জোর করে দখলে নেন তিনি। যাঁর বিরুদ্ধে এত অভিযোগ সেই তিনি হচ্ছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক এজাবুল হক বুলি। তিনি স্থানীয় এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওদুদ বিশ্বাসের ডান হাত হিসেবে পরিচিত।

গত ২৯ জানুয়ারি কালের কণ্ঠে ‘এমপি ওদুদের ডান হাত বুলির অপকর্মে ডুবছে আওয়ামী লীগ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর সেই বুলির বিরুদ্ধে এবার অভিযোগ উঠেছে, শিক্ষকদের কাছ থেকে জোর করে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার। বুলির অনিয়ম-অপকর্ম নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মহিউদ্দিন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এনামুল হক ফিটুকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বুলি ও তাঁর ক্যাডাররা।

মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক অধ্যক্ষ এনামুল হক ফিটুকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়ায় ইতিমধ্যে বুলির বিরুদ্ধে  রাজশাহী বিভাগের অতিরিক্ত ডিআইজি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে প্রতিকার চেয়ে অভিযোগ করেছেন তিনি।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এনামুল হক ফিটু অভিযোগ করে বলেন, ‘কালের কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই বুলি আমাকে নানাভাবে হুমকি দিচ্ছেন। তিনি আমাকে প্রাণে মেরে ফেলারও হুমকি দিয়েছেন। এমনকি কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে গত সোমবার সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছেন। বুলি আমার পেনসনের টাকাটাও আটকে রেখেছেন। ফলে আমি এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছি। ’

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, কলেজটির সাবেক অধ্যক্ষ মুক্তিযোদ্ধা এনামুল হক ফিটুর ২০১৩ সালে অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় তিনি আরো দুই বছর সময় বাড়তি পেয়েছিলেন। সেই মতে এনামুল হকের অবসরে যাওয়ার কথা ছিল ২০১৫ সালে। কিন্তু এর আগেই জোর করে তাঁকে অবসর নিতে বাধ্য করেন বুলি। শুধু তা-ই নয়, এমপির সহযোগিতায় পাঁচজন সহযোগী অধ্যাপককে ডিঙিয়ে প্রভাষক থেকে অধ্যক্ষ হয়েছেন বুলি।

এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, বুলির দাপটে শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীরা অতিষ্ঠ। তিনি ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ে অগ্নিকাণ্ড এবং বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ডে অগ্নিসংযোগ করে বাস পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার পলাতক আসামি জামায়াত নেতা আবদুল্লাহ মাসুদ ও দুরুল হুদাকে সঙ্গে নিয়ে কলেজে দাপট সৃষ্টি করে রেখেছেন। তাঁরা দুজনই শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কলেজের প্রভাষক। পুলিশের খাতায় এই দুই জামায়াত ক্যাডার পলাতক আসামি হলেও বুলি গত সোমবারও তাঁদের নিয়ে কলেজে চলাফেরা করেছেন।

বুলির বিরুদ্ধে ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকাকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহারাজপুরে বোমাবাজিরও অভিযোগ ছিল। ওই মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত দুই নম্বর আসামি ছিলেন বুলি। কিন্তু ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় এমপি আবদুল ওদুদ বিশ্বাসের হাত ধরে আওয়ামী লীগে যোগদান করে এখন একক ক্ষমতার অধিকারী বুলি। তাঁর দাপটে অতিষ্ঠ হয়ে অনেকেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেও অভিহিত করেন তাঁকে।

কালের কণ্ঠ’র বিরুদ্ধে বুলির মামলা : কালের কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশের পর মামলা করেছেন এজাবুল হক বুলি। গত বুধবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ‘ক’ অঞ্চলের বিচারক জুয়েল অধিকারীর আদালতে এ মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় আসামি করা হয়েছে  কালের কণ্ঠ’র সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা কামাল, প্রকাশক ময়নাল হোসেন চৌধুরী, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হায়দার আলী ও রাজশাহীর ব্যুরো প্রধান রফিকুল ইসলামকে। মামলার আবেদনে বলা হয়, বাদী গত ইউপি নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান। সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় বাদীর পাঁচ কোটি টাকার মানহানি হয়েছে। মামলায় চারজনকে সাক্ষী করা হয়েছে। আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে আগামী ২ মার্চ আসামিদের প্রতি সমন জারি করেন।

প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ : ২৮ জানুয়ারি ২০১৭  দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায় ‘এমপি ওদুদের ডান হাত বুলির অপকর্মে ডুবছে আওয়ামী লীগ’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক এজাবুল হক বুলি। সংবাদটিকে মিথ্যা ভিত্তিহীন দাবি করে বুলি বলেন, ‘অচল ঠিকাদার সমিতি সচল করতেই আমাকে আহ্বায়ক হিসেবে জোরপূর্বক দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কলেজের চরম দুর্দশার সময় কলেজকে বাঁচাতে কলেজের পরিচালনা পরিষদ ও সব শিক্ষক-কর্মচারী ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। আমাকে জড়িয়ে যেসব বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ ছাপা হয়েছে তার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাচ্ছি। ’

 


মন্তব্য