kalerkantho


কালের কণ্ঠে খবর প্রকাশের পর তদন্ত

ময়মনসিংহের অন্বেষা স্কুল বন্ধের নির্দেশ

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ   

২১ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ময়মনসিংহের অন্বেষা স্কুল বন্ধের নির্দেশ

মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনায় জড়িত থাকার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় ময়মনসিংহের অন্বেষা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এসংক্রান্ত নির্দেশের চিঠি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের (ডিসি) হাতে এসে পৌঁছেছে। কালের কণ্ঠে প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরেই স্থানীয় পর্যায়ে আন্দোলনের শুরু এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঘোর বিরোধী ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর কুখ্যাত মোনেম খানের মেয়ে নাসরীন মোনেম খান। এর অধ্যক্ষও নাসরীন। ১৯৯৬ সালে ময়মনসিংহ শহরের নতুন বাজারের সাহেব আলী সড়কে ইংলিশ মিডিয়াম এই প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে। এটি ব্রিটিশ কাউন্সিল অনুমোদিত। এতে প্লে গ্রুপ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। শিক্ষার্থী তিন শর মতো।

প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পাকিস্তানি আদর্শ লালন, বাংলাদেশের পরিবর্তে পাকিস্তানের ইতিহাস পড়ানো, একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত স্বাধীনতাবিরোধী মোনেম খানের নামে প্রতিষ্ঠানটি উৎসর্গ করা ও তাঁর নামের আগে ‘শহীদ’ শব্দটি লেখা, প্রতিষ্ঠানের মনোগ্রামে চাঁদ-তারা খচিত পাকিস্তানের পতাকার চিহ্ন এবং রাষ্ট্রীয় কোনো বিধিবিধান অনুসরণ না করার অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগ নিয়ে গত ২২ সেপ্টেম্বর কালের কণ্ঠ’র শেষ পাতায় “অন্বেষা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ : স্বাধীনতাবিরোধী মোনেম খান ‘শহীদ’!” শীর্ষক খবর প্রকাশিত হয়। এর পরই স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার পক্ষের ব্যক্তি-সংগঠনগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। বিষয়টি নিয়ে ময়মনসিংহের নব্বইয়ের দশকের সাবেক ছাত্রনেতারা যৌথ সভা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দেন। জেলা প্রশাসক বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকাশিত খবরের সত্যতা পান। জেলা প্রশাসন বিষয়টি জানিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়। এরপর গত ৮ অক্টোবর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে ময়মনসিংহ সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘ।

এর পরও বেপরোয়া ছিল এ স্কুলের কর্তৃপক্ষ। নতুন বছরে শিক্ষার্থী ভর্তির সময় বিলি করা হাজার হাজার লিফলেটে তারা আবারও মোনেম খানকে ‘শহীদ’ উল্লেখ করে। এ নিয়ে গত ৮ জানুয়ারি কালের কণ্ঠে আবারও একটি খবর প্রকাশিত হয়। এ নিয়ে সাবেক ছাত্রনেতারা পত্রিকায় বিবৃতি দেন। বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করেছিল, কিন্তু এরই মধ্যে স্কুলটি বন্ধে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত সবার মধ্যে স্বস্তি বয়ে এনেছে। এ সিদ্ধান্তের জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্বাধীনতার পক্ষের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সাবেক ছাত্রনেতারা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব চৌধুরী মুফাদ আহমদ জানিয়েছেন, সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কাছে আসা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে। তিন সদস্যের ওই কমিটি গত সপ্তাহে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করে। তাতে ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রণালয়। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের কোনো সংস্থা থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এটি অবৈধভাবে চলছিল।

ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. খলিলুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চিঠি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পেয়েছি। অফিস খোলার পরই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ময়মনসিংহের নব্বইয়ের দশকের ছাত্রনেতাদের পক্ষে অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম চুন্নু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সরকারকে অভিনন্দন জানাই। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসনের ভূমিকারও প্রশংসা করি।’ তিনি আরো বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী যেকোনো কর্মকাণ্ড ময়মনসিংহ শহরে সাবেক ছাত্রনেতারা প্রতিহত করবে।’



মন্তব্য