kalerkantho


মোংলা বন্দরের উদ্ধারকারী জাহাজ না থাকায় বিড়ম্বনা

ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধার অনিশ্চিত

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

২১ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সুন্দরবনের অদূরে বঙ্গোপসাগরের ফেয়ারওয়ে বয়া এলাকায় ডুবে যাওয়া কয়লাবাহী কার্গো জাহাজটি উদ্ধার সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তীব্র স্রোত, গভীরতা ও উদ্ধারকারী জাহাজ না থাকা—এ তিন কারণে কার্গো জাহাজটি উদ্ধার সম্ভব হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।

গত ১৩ জানুয়ারি সকাল ৮টার দিকে এক হাজার মেট্রিক টন কয়লাবোঝাই লাইটারেজ জাহাজ এমভি আইচগাতি ডুবে যায়। গত পাঁচ দিনেও এই জাহাজ উদ্ধারে কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। গতকাল মঙ্গলবার কার্গোডুবির স্থানটি পর্যবেক্ষণে একটি দল সেখানে গেছে।

গত তিন বছরে পশুর নদ ও সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকায় কয়লা, সার ও জিপসাম নিয়ে একাধিক কার্গো জাহাজ ডুবেছে। গত বছরের ১৯ মার্চ শেলা নদীর ধানসাগর এলাকায় এক হাজার ২৩৫ টন কয়লা নিয়ে ডুবে যায় কার্গো জাহাজ এমভি জাবালে নূর। এর আগের বছর ২০১৫ সালের ২৭ অক্টোবর ৫১০ মেট্রিক টন  কয়লা নিয়ে পশুর নদীর চিলা এলাকায় নবনির্মিত খাদ্যগুদামের (সাইলো) কাছে ডুবে যায় কার্গো জাহাজ এমভি জিয়ারাজ। এর আগে পশুর নদীর হারবাড়িয়া এলাকায় সিমেন্ট  তৈরির কাঁচামাল জিপসাম নিয়ে ডুবে গিয়েছিল এমভি সি হর্স। এই স্থানগুলোর সবই সংরক্ষিত সুন্দরবন এলাকায়।

এ ছাড়া সুন্দরবন এলাকার বাইরেও একাধিক কার্গো জাহাজ ডুবির ঘটনা ঘটেছে। গত ৬ জানুয়ারি মোংলা থেকে এক হাজার ১০০ টন কয়লাবোঝাই এমভি ডায়মন্ড অব নারিশা খুলনার ফুলতলা এলাকার ভৈরব নদে ডুবে যায়। ২০১৬ সালের ১২ অক্টোবর খুলনার রূপসা নদীতে ৮০০ টন ক্লিংকারবাহী এমভি টুঙ্গিপাড়া ডুবে যায়। প্রকৃতপক্ষে ভৈরব-রূপসা-কাজীবাছা-পশুর একটি চ্যানেল; অবস্থানভেদে নাম ভিন্ন এই যা।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণত এসব লাইটারেজ জাহাজ অনেক পুরনো, যন্ত্রপাতি বিকল; আবার এগুলোর ইনস্যুরেন্স সুবিধাও থাকে। এসব নৌযানে বহন করা পণ্যসামগ্রীও ইনস্যুরেন্সের আওতাভুক্ত হওয়ায় মালিকপক্ষ ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারে কখনো কখনো ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করে। এমভি আইচগাতি এবং এতে বহন করা কয়লাও ইনস্যুরেন্স সুবিধাযুক্ত ছিল বিধায় জাহাজটি উদ্ধারের ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের তেমন গরজ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।

অবশ্য কার্গো মালিক গাজী গোলাম ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কার্গোটি তোলার জন্য চট্টগ্রামের একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে আলাপ-আলোচনা চলছে। সাগরে যেহেতু দুর্ঘটনাটি ঘটেছে সে কারণে উদ্ধারকারী জাহাজ ও দল শক্তিশালী হতে হবে; এ জন্য দেরি হচ্ছে।’

এদিকে মোংলা বন্দরের নিজস্ব কোনো উদ্ধারকারী জাহাজ নেই। বন্দর এলাকায় এমন দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত অপসারণ করার জন্য তারা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না। উদ্ধারকারী জাহাজের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের বিআইডাব্লিউটিএর (বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ) ওপর নির্ভর করতে হয়। আর বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের চ্যানেলের অবস্থার ওপর নজর রাখে। এমভি আইচগাতি ডুবে যাওয়ায় চ্যানেলে সরাসরি কোনো বিপর্যয় সৃষ্টি না হওয়ায় বন্দর কর্তৃপক্ষ জাহাজটি উদ্ধারে তেমন চিন্তিত নয়।

এ প্রসঙ্গে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার এম ওয়ালিউল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কয়লাভর্তি কার্গোটি যে স্থানে ডুবেছে তাতে এ মুহূর্তে বন্দর চ্যানেল নিরাপদ। তবে ডুবে যাওয়া কার্গোটি উদ্ধার করা না হলে কার্গোর আশপাশে পলি জমে বন্দর চ্যানেলের জন্য হুমকি হতে পারে। একটি নির্দিষ্ট সময় দিয়ে কার্গো মালিককে কার্গো উত্তোলন করে নিতে বলা হয়েছে। ব্যর্থ হলে বন্দর কর্তৃপক্ষ উত্তোলন করে বন্দরের আইনানুসারে কর্তৃপক্ষের সম্পদ হিসেবে গণ্য করবে।’

মোংলা বন্দর ব্যবহারকারী সমন্বয় কমিটির মহাসচিব সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মোংলা বন্দরকে নিজস্ব উদ্ধারকারী জাহাজ সংগ্রহের জন্য বারবার তাগাদা দিয়েছি, কিন্তু কর্তৃপক্ষ এখনো উদ্ধারকারী জাহাজ সংগ্রহ করতে পারেনি।’ বন্দর কর্তৃপক্ষের এ ধরনের আয়োজন থাকলে অতি সহজেই পরিবহন ব্যবসায়ীরা সেই সুযোগ নিতে পারতেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

প্রসঙ্গত, ইন্দোনেশিয়ান পতাকাবাহী জাহাজ এমভি লেডিমেরি থেকে এক হাজার ১০ টন কয়লা বোঝাই করে লাইটারেজ জাহাজ আইচগাতি যশোরের নওয়াপাড়ার উদ্দেশে যাত্রা করে। ফেয়ারওয়ে বয়া থেকে আট থেকে দশ কিলোমিটার দূরে তলা ফেটে সাগরে ডুবে যায় জাহাজটি। ওই সময় পাশ দিয়ে যাওয়া বসুন্ধরা গ্রুপের লাইটারেজ জাহাজ লজিস্টিক ৩৭-এর কর্মচারীরা ডুবে যাওয়া জাহাজের ১২ জন নাবিক ও চারজন নিরাপত্তাকর্মীকে উদ্ধার করেন।



মন্তব্য