kalerkantho


শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে আবর্জনার স্তূপ

আজিম হোসেন, বরিশাল   

২১ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



শ্বাসকষ্ট হওয়ায় সপ্তাহখানেক আগে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে ভর্তি করা হয় দুই বছরের সাদমান ইসলামকে। চিকিৎসকের চেষ্টায় তিন দিনের মধ্যেই সাদমান শ্বাসকষ্ট থেকে মুক্তি পায় ঠিকই, কিন্তু আরেকটি নতুন রোগ দেখা দেয় তার। চিকিৎসকরা সাদমানের বাবা আবুল কালামকে জানান, তাঁর ছেলের ম্যালেরিয়া হয়েছে। হাসপাতালেই মশার কামড়ের কারণে এ রোগ হয়েছে বলেও চিকিৎসকরা তাঁর কাছে স্বীকার করেন।

ছাদ থেকে পড়ে হাত ভেঙে ২ জানুয়ারি ওই হাসপাতালের অর্থপেডিকস বিভাগে ভর্তি হন নগরের আমানতগঞ্জ এলাকার এছহাক সরদার। গত মঙ্গলবার হাসপাতাল থেকে তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়ার কথা। কিন্তু রবিবার হঠাৎ করেই তাঁর ডায়রিয়া শুরু হয়। তাঁকে পাঠানো হয় ডায়রিয়া বিভাগে। চিকিৎসকরা এছহাক সরদারের পরিবারকে জানিয়েছেন, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে থেকে খাবার গ্রহণ করায় তাঁর ডায়রিয়া হয়েছে।

এছহাক সরদার বা শিশু সাদমানই শুধু নয়, শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এমন অসংখ্য মানুষের এক রোগ সারাতে এসে অন্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা রয়েছে। এর কারণ হাসপাতালের ভেতরের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ।

গত বুধবার সরেজমিনে হাসপাতালের শিশু বিভাগ, অর্থপেডিকস বিভাগ, লেবার ওয়ার্ড, মেডিসিন ও গাইনি বিভাগ ঘুরে দেখা গেছে, ওই সব ওয়ার্ডে আবর্জনা স্তূপ হয়ে আছে। বিছানাগুলোর নিচে দেখা যায় আবর্জনা। আবর্জনার মধ্যে মশা, মাছি ভনভন করছে। আবর্জনার মধ্যে থাকা খাবারের উচ্ছিষ্ট খেতে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরছে বড় বড় বিড়াল।

কথা হয় আমেনা বেগম নামের শিশু ওয়ার্ডে থাকা এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সঙ্গে। তিন বলেন, ‘আমাদের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নামেমাত্র বেতন দেয়। চাকরিও স্থায়ী না। একটি ওয়ার্ডে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দেয়। যতটুকু পারি পরিষ্কার করি। এর চেয়ে বেশি সম্ভব নয়।’

লেবার ওয়ার্ডে কথা হয় এক রোগীর স্বজন নূরে জান্নাতের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা সাত দিন ধরে এই ওয়ার্ডে আছি। এর মধ্যে মাত্র এক দিন ময়লা পরিষ্কার করেছে এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী। ছয় দিনের ময়লাই ওয়ার্ডে জমা হয়ে আছে। এর মধ্যে আবার বিড়াল এসে খাবার খুঁজছে। মশা-মাছি তো আছেই। আমরা নিজেদের ইচ্ছায় যতটুকু পারছি বেডের আশপাশে পরিষ্কার রাখছি। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো খবর নেই।’

সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) বরিশাল জেলা শাখার সাবেক সভাপতি অধ্যাপক এম মোয়াজ্জেম হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে আমরা বেশ কিছু সভা করেছি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বলেছি অন্তত ওয়ার্ডগুলো পরিচ্ছন্ন রাখতে। কিন্তু কোনো কাজে আসেনি।’ তিনি আরো বলেন, হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে দুর্গন্ধের জন্য ঢোকা যায় না। ভেতরে ঢুকে শয্যার নিচে তাকালে মনে হয় ময়লার ভাগাড়। আর তাই এখানে চিকিৎসা নিতে এসে সাধারণ মানুষ সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে অন্য রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজের অর্থপেডিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মনিরুজ্জামান শাহীন আবর্জনা জমার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাসপাতালে জনবল কম। তাই সার্বক্ষণিক পরিষ্কার করা সম্ভব হয় না। প্রতিদিন তিনবার হাসপাতাল পরিষ্কার করা উচিত। আর এটা না হওয়ায় আবর্জনা জমা হয়। এ কারণে রোগ ছড়ায়।’

শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এ আর তালুকদার মুজীব বলেন, ‘শিশু বিভাগে প্রায়ই আবর্জনার স্তূপ থাকে, এটা সত্য। নিয়মিত পরিষ্কার না করার কারণেই আবর্জনা জমতে থাকে। আবর্জনার ওপর মশা বসা। ওই মশা ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ায়। এ ছাড়া এ আবর্জনার কারণে শিশুদের শ্বাসজনিত রোগ হচ্ছে।’

ডা. এ আর তালুকদার মুজীব আরো বলেন, ‘আমরা যখন ওয়ার্ডে প্রবেশ করি তখন পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দিয়ে আবর্জনা পরিষ্কার করাই। কিন্তু চলে গেলে আর পরিষ্কার হয় না। এমনটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও জানে।’

হাসপাতালের পরিচালক ডা. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতাল সার্বক্ষণিক যে পরিচ্ছন্ন থাকে তা নয়। প্রতিদিন সকালে একবার পরিষ্কার করা হয়। এরপর সারা দিন হাসপাতালের অনেক ওয়ার্ডে হয়তো ময়লা জমতে থাকে। আমাদের লোকবল সংকট থাকার কারণে বারবার পরিষ্কার করা সম্ভব হয় না। তবে আমরা চেষ্টা করি পরিচ্ছন্ন রাখার।’

তবে পরিচালক দাবি করেন, হাসপাতাল বেশি অপরিচ্ছন্ন হয় দর্শনার্থীদের কারণে। একজন রোগীর সঙ্গে চার-পাঁচজন দর্শনার্থী আসার কারণে তারা যে খাবার খায় তার উচ্ছিষ্ট সারা দিন জমতে থাকে। তা আর পরিষ্কার করা হয় না।



মন্তব্য