kalerkantho


তিস্তার ৫০ খেয়াঘাট বন্ধ দুর্ভোগে জনজীবন

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

২১ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



তিস্তার ৫০ খেয়াঘাট বন্ধ দুর্ভোগে জনজীবন

তিস্তা নদী নাব্যতা হারানোর কারণে রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামের ছোট-বড় ৫০টি খেয়াঘাট প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে নৌপথে চলাচলকারী সাধারণ মানুুষের দুর্ভোগের পাশাপাশি নদী অঞ্চলের জনজীবনেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। লোকসানের মুখে পড়েছে খেয়াঘাট ইজারাদার ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা। বেকার হয়েছে মাঝিমাল্লা।

জানা যায়, ৩১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ খরস্রোতা তিস্তা নদী ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের দার্জিলিং-জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এরপর নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারীর ভেতর দিয়ে ১১৫ কিলোমিটার অতিক্রম করে ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মিশেছে। ভারত তিস্তার উজানে পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবায় বাঁধ দিয়েছে।

বর্ষায় তিস্তার দুই কূল উপচে সৃষ্ট বন্যা ও ভাঙনে লোকজন সর্বস্বান্ত হলেও শুকনো মৌসুমে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে নদীতে তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে। তিস্তার বুকজুড়ে ধু ধু বালুচর জেগে উঠেছে।

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার সীমানা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার দোয়ানীতে তিস্তা নদীর ওপর তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়েছে। ব্যারাজের ৪৪টি গেট বন্ধ করে উজান থেকে আসা নিংড়ানো পানিটুকু সেচকাজে ব্যবহার করায় নদীর ভাটিতে ছোট-বড় ৫০টি ঘাট প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, চার জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীর বিভিন্ন চ্যানেলে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৫০টি খেয়াঘাট রয়েছে। এর মধ্যে নৌপথ হিসেবে চিহ্নিত জনগুরুত্বপূর্ণ ৩২টি বড় খেয়াঘাট প্রতিবছর ইজারা দেওয়া হয়। এগুলো হলো নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলায় ভাবনপুর ও ডাউয়াবাড়ী খেয়াঘাট, ডিমলা উপজেলায় বাইশপুকুর, খড়িবাড়ী ও কালিগঞ্জ খেয়াঘাট, রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় মহিপুর-কাকিনা, কানকাটা ঘাট, নোহালী, ডারকাডোবা ও রামকুণ্ডা খেয়াঘাট, কাউনিয়া উপজেলায় ঢুষমারা চর খেয়াঘাট, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় তিস্তা-পাগলা, ঠুটাপাইকর, পানিয়ালের ঘাট, বজরা, সাদুয়া খামার, রাজারহাট উপজেলায় বিদ্যানন্দ ও নাখেন্দা খিতাব খেয়াঘাট এবং লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় চরগড্ডিমারী ঘাট, পারুলিয়া ও সিন্দুর্ণা খেয়াঘাট, লালমনিরহাট সদরের বাংটুর ঘাট, আমজাদের ঘাট, আদিতমারীতে গোবর্ধন ও চণ্ডিমারী খেয়াঘাট, কালীগঞ্জে বৈরাতি ঘাটসহ রয়েছে ১৪টি খেয়াঘাট।  

সরেজমিনে গিয়ে নদী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, হেঁটে নদী পার হচ্ছে লোকজন। হাজার হাজার পরিবার, যারা এ নদী ঘিরে গড়েছিল বসতি ও জীবন, তিস্তার এ করুণ পরিণতিতে এখন তারা পুরোপুরি বেকার। শুধু তিস্তায় পানি না থাকার কারণে এই অঞ্চলের ধরলা, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, আখিরা, দুধকুমোর, বুড়ি তিস্তাসহ প্রায় ৩৩টি ছোট-বড় নদ-নদীর শাখা খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে।

বাপ-দাদার পেশা আঁকড়ে ধরেছিলেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর এলাকার নৌকার মাঝি এনামুল হক। তিনি জানান, তিস্তা পারাপারে এখন আর নৌকা লাগে না। হেঁটে পার হয় লোকজন। তিনি বলেন, ‘হামরা মাঝিমাল্লা বেকার হয়া গেছি। হামার আর সংসার চলে না।’

ওই এলাকার বাসিন্দা দুলাল মিয়া, জয়নাল, মজিবর ঘাটিয়াল পেশায় সবাই মাঝিমাল্লা। নিজেদের ভিটামাটি নেই। তাঁদের ভাষায়, গত এক মাস থেকে তাঁরা বলতে গেলে বেকার। নদীতে পানি না থাকায় নৌকা চলে না। তাই তাঁরা এখন পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন। কাজের সন্ধানে ছুটছেন দক্ষিণাঞ্চলে এবং ঢাকা শহরে।

মহিপুর-কাকিনা খেয়াঘাটের ইজারাদার গোলাম রব্বানী জানান, এ ঘাট পেরিয়ে বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ লালমনিরহাটের চারটি উপজেলার মানুষ বিভাগীয় নগর রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করে। বর্তমানে এ ঘাটের ডাক হয় ৫০ লাখ টাকারও বেশি। এর আগের বছরে ২৮ লাখ টাকায় ঘাট ডাকা হলেও নদীতে পানি না থাকায় মৌসুমের শেষে ঠিকমতো নৌকা চলেনি। এ কারণে আসল টাকাও ওঠেনি। লোকজন নৌকায় না উঠে হেঁটেই চলাচল করে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে খেয়াঘাটের গুরুত্ব আর থাকবে না।

লালমনিরহাটের কাকিনা এলাকার ওছমান আলী হেঁটে নদী পার হয়ে আসছিলেন। তিনি জানালেন, পানি না থাকায় নৌকা ঠিকমতো চলে না, তাই সময় লাগে বেশি। পরনের ভেজা কাপড় দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘ঠেকায় (দায়ে) পড়ি হাঁটি আসনু। ইয়াতে কষ্ট হয় খুব।’

বর্তমানে কানকাটার ঘাট ও ডারকাডোবার ঘাটে লোকজনের যাওয়া-আসা নেই বললেই চলে। নদীতে ঠিকমতো পানি না থাকায় মাঝিরা নৌকা বেঁধে রেখেছে।

এভাবে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর নাব্যতা অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পাওয়ায় কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী, বগুড়া ও জামালপুর জেলার ১৬টি উপজেলার ৫৪ খেয়াঘাটসহ শতাধিক নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে বলেও জানা যায়। বালুচর জেগে ওঠায় বন্ধ হয়ে যাওয়া নৌঘাটগুলোর মধ্যে রয়েছে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার পাঁচটি, রৌমারীর চারটি, রাজীবপুরের তিনটি, কুড়িগ্রাম সদরের তিনটি ও ভূরুঙ্গামারীর তিনটি, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের পাঁচটি, গাইবান্ধা সদরের আটটি, ফুলছড়ির ১২টি, সাঘাটার ছয়টি, জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার তিনটি, দেওয়ানগঞ্জের পাঁচটি, বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার দুটি ও সারিয়াকান্দির তিনটি।

এসব নৌঘাট সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৩০ লাখেরও বেশি মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে।

রংপুর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী রুহুল আমীন খান জানান, ক্রমাগত ভাঙনসহ নাব্যতা হ্রাসের কারণে স্বাভাবিক গতি-প্রকৃতি হারিয়ে ফেলছে এসব নদী। এ ছাড়া পানিবণ্টন নীতিমালা না থাকায় নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে তিস্তার করুণ দশা উল্লেখ করে রুহুল আমীন বলেন, খেয়াঘাট থেকে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হয়। কিন্তু নদীতে নাব্যতা না থাকায় এসব ঘাট আজ বন্ধের পথে। বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে ঘাট-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জনজীবনে।



মন্তব্য