kalerkantho


জালচক্রের হাত থেকে কি বাঁচবে ‘সবেধন নীলমণি’?

শেখ শাফায়াত হোসেন   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



একটু বেশি দামে বিক্রির আশায় সারা বছর পেলে-পুষে বড় করা গবাদি পশুগুলো দূর-দূরান্ত থেকে হাটে নিয়ে আসছেন খামারিরা। এ টাকায় চলে তাঁদের ভরণপোষণ, সন্তানের লেখাপড়া।

কিছু টাকা দিয়ে আবারও শুরু করেন গরু-ছাগল পালন। পরের বছর আবারও একইভাবে হাটে নিয়ে বেচেন সেগুলো। এভাবেই চলতে থাকে এ দেশের খামারিদের জীবনচক্র। এতে হঠাৎ ছেদ পড়ে, যখন জালচক্রের ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হন তাঁরা। অনেক ক্ষেত্রে ধারদেনা করে অথবা বাকিতে গোখাদ্য কিনে এসব গবাদি পশু বড় করেন গরিব খামারিরা। কোরবানির সময় একটু বেশি দামে বিক্রি করে সব দেনা মিটিয়ে দেওয়ার আশায় থাকেন। কিন্তু সেই পশু বিক্রি করে যখন হাতে আসে জাল টাকা তখন তাঁদের দুনিয়াই অন্ধকার! গত শুক্রবার তো কুষ্টিয়া থেকে হাটে আনার সময় একটি গরু মারা যাওয়ায় ওই খামারিও হার্ট অ্যাটাকে মারা যান।

এসব জালকারবারির অপতৎপরতা থেকে খামারিদের রক্ষা করতে এবার সব পশুর হাটে জাল নোট শনাক্তকারী মেশিন নিয়ে বসেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। ঈদের আগের রাত পর্যন্ত রাজধানীর ২২টি হাটে ৪৫টি ব্যাংক বুথে এ সেবা দেওয়া হবে বিনা মূল্যে।

এমনকি গ্রাম থেকে আসা যেসব খামারি একসঙ্গে অনেক টাকা গুনতে অসুবিধায় পড়েন, তাঁদেরও সাহায্য করছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। প্রতিটি ব্যাংকের বুথে দুজন করে কর্মকর্তা নোট যাচাইয়ের কাজ করছেন। অধিকাংশ হাটে গতকাল শনিবার থেকে এ সেবা শুরু হয়েছে।

গতকাল রাজধানীর মেরুল বাড্ডা হাটে গিয়ে কথা হয় আইএফআইসি ব্যাংকের বুথে দায়িত্ব পালনরত দুই কর্মকর্তার সঙ্গে। দুজনই ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে জুনিয়র অফিসার হিসেবে আছেন। একজন মো. মাহমুদ হাসান, অন্যজন হারুন অর রশিদ চৌধুরী। হারুন অর রশিদ চৌধুরী জানান, শনিবার থেকে তাঁরা নোট যাচাই সেবা দিতে শুরু করেছেন। তাঁদের সঙ্গে রয়েছে দুটি জাল নোট শনাক্তকারী মেশিন।

মাহমুদ হাসান জানান, ঈদের আগের রাত পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টা তাঁরা এ সেবা দেবেন পালাক্রমে।

পাশেই রয়েছে ট্রাস্ট ব্যাংকের জাল নোট শনাক্তকারী মেশিনের বুথ। এখানে দায়িত্ব পালন করছেন গুলশান করপোরেট শাখার জুনিয়র অফিসার হাবিবুর রহমান। ব্যাংকটি এ সেবা দিচ্ছে শুক্রবার থেকে। তবে শনিবার পর্যন্ত কোনো জাল নোট ধরা পড়েনি বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

জাল নোট ধরা পড়লে কী করবেন জানতে চাইলে আইএফআইসি ব্যাংকের কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া আছে সেগুলোকে ছিদ্র (পাঞ্চ) করে নষ্ট করে ফেলার। পরে তা ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও হাটে অবস্থানরত পুলিশকে জানাতে হবে। সর্বোপরি বাংলাদেশ ব্যাংককে বিষয়টি জানাতে হবে। ’

বাড্ডা হাটে নিজের বাড়িতে পোষা দুটি গরু নিয়ে কুষ্টিয়া থেকে এসেছেন রহমত আলী। গ্রামে বসতভিটা ছাড়া আর কোনো জমি নেই তাঁর। ওই গরু দুটিই তাঁর ‘সবে ধন নীলমণি’। রহমত আলী বলেন, ‘এই গরু বিক্রি করে আমার পরিবারের সারা বছরের খোরাকির টাকা হবে। ছেলেমেয়ের স্কুলের বেতন, বই-খাতা কেনার টাকা পাব। ঈদের আগে গরুগুলোকে ভালোমানের খৈল-ভুসি কিনে খাওয়াতে কিছু টাকা দেনাও হয়েছে। সেই টাকা শোধ দিতে হবে। তা ছাড়া আগামী বছর বিক্রির জন্য এবার চারটি বাছুরও কিনব। এখন অপেক্ষা করছি ভালো দামের খদ্দেরের। ’

কোরবানির পশুর হাট লক্ষ্য করে জাল নোট বিস্তারের চেষ্টায় থাকা কয়েকটি জালচক্র ধরাও পড়েছে সম্প্রতি। গত ২ সেপ্টেম্বর এক কোটি টাকারও বেশি জাল নোটসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ নিয়ে উত্কণ্ঠায় রয়েছেন খামারিরা। অনেকেরই আশঙ্কা, এই জালচক্রের হাত থেকে শেষ পর্যন্ত বাঁচবে তো তাঁদের ‘সবে ধন নীলমণি’?


মন্তব্য